কূলিন সাংবাদিক ও সম্পাদক পরিষদ!
- আপডেট টাইম : ০৫:৪৩:০৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬
- / ৫৮ বার

১৭ মে সংবাদপত্র সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদের নেতারা প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠক করেছেন। এ সময় তারা বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত ২৮২ সাংবাদিকের তালিকা প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে ৯৪ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন হত্যা মামলার অভিযোগ রয়েছে। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান সম্পাদক পরিষদের কয়েকজন সদস্য। সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জনপ্রশাসন সভাকক্ষে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতের জন্য আইনের অগণতান্ত্রিক ধারা বাতিল ও পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছে সম্পাদক পরিষদ। সূত্র: দৈনিক কালেরকণ্ঠ, ১৮ মে ২০২৬ইং। বিস্তারিত নিউজটি পড়তে পারেন। https://shorturl.at/QHg5Z
আওয়ামী রেজিমের সন্ত্রাস, অরাজকতা, লুটপাট, সীমাহীন দূর্নীতির চিত্র তুলে ধরার কারণে ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ৬১ জন সাংবাদিক খুন হয়েছেন। অনেক সাংবাদিক নিপীড়নের শিকার হয়ে দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। একই সময়ে হত্যা এবং নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ৩ হাজার ৫৮৮ সাংবাদিক। শুধু জুলাই বিপ্লবের সময় ৬ জন সাংবাদিক খুন হয়েছেন। আওয়ামী রেজিমের মতো সাংবাদিক, লেখক ও বুদ্ধিজীবী নির্যাতন দেশের ইতিহাসে আর হয়নি।
২০১৬ সালের ১৬ এপ্রিল প্রবীণ সাংবাদিক ও যায় যায় দিন সম্পাদক শফিক রেহমানকে হাসিনা পুত্র সজিব ওয়াজেদ জয়কে কথিত হত্যা চেষ্টার সাজানো মামলায় আটক করা হয়। তিনি জামিনে মুক্তি পাবার পর বিদেশ চলে যান।
২০১৯ সালের ১৩ ডিসেম্বর প্রবীণ সাংবাদিক ৮০ বছরের বেশি বয়োবৃদ্ধ দৈনিক সংগ্রাম সম্পাদক আবুল আসাদকে ছাত্রলীগের পান্ডারা তার দাড়ি ধরে টেনে-হিছড়ে পুলিশে দেয়। তাকে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের মামলায় জড়ানো হয়। তিনি ১ বছরের বেশি সময় কারাগারে ছিলেন।
২০২০ সালের ২১ অক্টোবর প্রবীণ সাংবাদিক ও ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনকারী সাংবাদিক নেতা রুহুল আমিন গাজীকে আটক করা হয়। সাজানো রাষ্ট্রদ্রোহ ও ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের মামলায় ১ বছরের বেশি সময় তিনি কারাগারে ছিলেন।
সবচেয়ে বেশি নির্যাতন ও কারাভোগ করেছেন দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। এছাড়া সাংবাদিক অলিউল্লাহ নোমান, ড. কনক সরওয়ার, ইলিয়াস হোসেন, ড. শহিদুল আলম, শফিকুল ইসলাম কাজল, আহমেদ কবির কিশোরসহ বহু সাংবাদিক জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন। ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের মামলায় আমি নিজে পুরো ১ বছর কারাগারে ছিলাম। ২০১৮ সালের ১৩ ডিসেম্বর মধ্যরাতে আমাকে বিনা ওয়ারেন্টে ডাকাতের মতো আটক করে প্রায় ৪২ ঘন্টা চট্টগ্রামের খুলশীর পিবিআই অফিসের লকআপে রাখা হয়। এরপর ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের মামলা দিয়ে আমাকে আদালতে চালান করা হয়। কারাগারে থাকা অবস্থায় আমাকে আরো ২টি মামলায় জড়ানো হয়। ১ বছর কারাভোগের পর আমি জামিনে মুক্তি পাই। আমার বিরুদ্ধে ফতুল্লা থানায় দায়ের করা তথ্যপ্রযুক্তি আইনের মামলায় ২য় বার নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে যাবার পর সেখানে দৈনিক সময়ের কণ্ঠ পত্রিকায় সম্পাদক বোরহান হাওলাদার জসিমসহ মোট ৫ সাংবাদিকের দেখা পাই। আওয়ামী রেজিমের আলোচিত ডিবি প্রধান হারুন উর রশিদ গাজীপুরের এসপি থাকাকালে তার দূর্নীতির বিরুদ্ধে নিউজ করায় তাদের ৫জনকে আটক করা হয়। তাদের প্রত্যেককে ৩টি করে মামলা দিয়ে আদালতে চালান করা হয়।
সম্পাদক পরিষদ বিশেষ করে মাহফুজ আনামের কাছে আমাদের প্রশ্ন আপনি কি আমাদের সাংবাদিক মনে করেন না? যদি মনে করেন তাহলে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হাসিনার কাছে কয়জন নির্যাতিত সাংবাদিকের তালিকা দিয়েছিলেন? আপনি হাসিনা রেজিমে সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ছিলেন। তখন আপনার ভূমিকা কি ছিল? এ প্রশ্নটা স্বাভাবিক ভাবেই সামনে আসবে।
সনাতন ধর্মে প্রজাপতি ব্রহ্মা হলেন মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা এবং সর্বোচ্চ ত্রিমূর্তি (ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব) এর অন্যতম। তিনি বেদ ও জ্ঞানের উৎস। তার মূল কাজ হলো বিশ্বব্রহ্মান্ড ও সমস্ত জীবের সৃষ্টি করা।
সনাতন ধর্মীয় গ্রন্থাদিতে (যেমন: বেদ ও মনুসংহিতা’য়) মানুষের গুণ ও কর্মের ভিত্তিতে সৃষ্ট চারবর্ণের উৎস সম্পর্কে বলা হয়েছে প্রজাপতি ব্রহ্মার শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে এ চারবর্ণের মানবের জন্ম হয়েছে। যেমন: ১. মুখ থেকে ব্রাহ্মণ, ২. বাহু থেকে ক্ষত্রীয়, ৩. পেট বা ঊরু থেকে বৈশ্য এবং ৪. পা বা চরণ থেকে শূদ্র।
সনাতন ধর্মে ব্রাহ্মণরা হলো উচ্চ বংশীয় কূলিন সম্প্রদায়। ধর্মীয় গ্রন্থে নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও ব্রাহ্মণ ছাড়া অন্যবর্ণের লোককে সাধারণত পূজা-অর্চনা করার অনুমতি দেয়া হয় না।
সংস্কৃত শব্দ ‘কূলীন’ বা ‘কূলিন’ শব্দের অর্থ উচ্চ বংশজাত বা সম্ভ্রান্ত বংশের ব্যক্তি। অভিজাত বা বনেদি পরিবারের কাউকে বুঝাতে এ শব্দটি ব্যবহার করা হয়।
কৌলিন্য হলো “হিন্দুকুল ও বর্ণ সমীকরণ আইন” যা বল্লাল সেন দ্বারা ১১৫৮-৬৯ সনে সেন সাম্রাজ্যে প্রবর্তিত হয়। সেন শাসন পরবর্তী সময়ে এটা “প্রথা” হিসেবে রূপলাভ করে। কূলিন থেকে কৌলিন্য শব্দের উৎপত্তি।
সম্মান অর্জনের জন্য প্রজারা সৎপথে চলবে। এ উদ্দেশ্যে বাংলার সেন বংশের রাজা বল্লাল সেন কৌলিন্য প্রথা সৃষ্টি করেছিলেন। বাচস্পতি মিশ্রের মতে, কূলীন চিহ্নিত হয় আচার (শুদ্ধতা), বিদ্যা (জ্ঞান), বিনয় (শৃঙ্খলাবোধ), প্রতিষ্ঠা (শুদ্ধতার খ্যাতি), তীর্থ-দর্শন (তীর্থযাত্রা), নিষ্ঠা (কর্তব্যনিষ্ঠা), তপস্যা (কঠোর ধ্যান), আবৃত্তি (সমবর্ণে বিবাহ) এবং দান (উদারহস্ত) দিয়ে।
এরূপ যোগ্য পরিবারের সাথে বৈবাহিক সূত্র স্থাপনের মাধ্যমে সাধিত হতো জাত্যৎকর্ষ এবং এর ফলে কোনো একটি বর্ণের ব্যক্তির জন্য কূলিন সমাজে প্রবেশের দ্বার উন্মোচিত হতো।
তাহলে কি সম্পাদক পরিষদ ও মাহফুজ আনাম-মতিউর রহমান এবং কতিপয় চিহ্নিত সাংবাদিক সনাতন ধর্মের বিশেষ শ্রেণি ব্রাহ্মণদের মতো নিজেদের কূলিন ভাবতে শুরু করেছেন? তারা ছাড়া আর কাউকে সাংবাদিক মনে করেন না?
সম্পাদক পরিষদ ও মাহফুজ আনামদের প্রতিবাদ, উদ্বেগ আর বিবৃতি শুধু নির্দিষ্ট কিছু মানুষ বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ কতিপয় লোকের জন্য?
বিএনপি ক্ষমতায় আসার সাথে সাথে তারা কৌশলে প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ট হয়ে যাচ্ছেন! সব স্বাধীনতা বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসলে ভোগ করতে হবে কেন? এখন এতো দাবি-দাওয়ার বহর নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দরজায় কড়া নাড়ছেন! লীগের আমলে চুপচাপ ছিলেন কেন? আমার সাংবাদিকতার বয়স ৩০ বছর চলছে। মিডিয়ার জগতের অনেক কিছু গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছি। আমরা আপনাদের অতীত ইতিহাস ভুলে যাইনি।
১/১১ সরকারের আমলে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার সম্পাদকরা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিরুদ্ধে জঘন্য তথ্যসন্ত্রাস চালিয়েছেন। এসব ইতিহাস কি এতো তাড়াতাড়ি মুছে যাবে? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে, হাসিনাকে দানব বানানোর পেছনে প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, বিচারে বিভাগের পর সবচেয়ে বেশি দায়ী ছিল মিডিয়া। এতে মতিউর ও মাহফুজ আনামদের অনেক দায় আছে। সে দায় থেকে তারা এতো সহজে মুক্তি পাবেন কিভাবে? হাসিনাকে দানব বানানো ও ভিন্নমতাবলম্বী সাংবাদিক, লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের ওপর হামলা-মামলা, জেল-জুলুমের সময় নিরব থাকার জন্য তাদের অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।
সম্পাদক পরিষদ নেতৃবৃন্দের প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করার বিষয় নিয়ে সিনিয়র সাংবাদিক মারুফ কামাল খানসহ আরো অনেক নির্যাতিত সাংবাদিক তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এ ক্ষোভ খুবই স্বাভাবিক। এ বিষয়ে আমার নিজের ক্ষোভ অন্য সবার চেয়ে অনেক বেশি। ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের মামলায় কারাগারে থাকার সময় ডান ও বাম ঘরানার বহু সাংবাদিকের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি। তাদের সবার আচরণ ছিল জঘন্য। সময়মত তাদের মুখোশ উন্মোচন করা হবে। হাসিনা রেজিমে সাংবাদিক নির্যাতনের বিষয় নিয়ে আমি সবচেয়ে বেশি লেখালেখি করেছি। ইন্টারিম সরকারের আমলেও এ বিষয় নিয়ে অনেকবার লিখেছি।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান লন্ডন থেকে দেশে ফিরে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় অনুষ্ঠান করেছেন। সে অনুষ্ঠানেও ফ্যাসিবাদী রেজিমের সহযোগী সাংবাদিকদের আধিক্য দেখা গেছে। অথচ সাংবাদিকতার মর্যাদা ও সম্মান রক্ষাকারী নির্যাতিত সাংবাদিকদের ব্যাকফুটে ঠেলে দেয়া হচ্ছে।
হাসিনা রেজিমে সাংবাদিক নির্যাতনের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হবার কথা। দুর্ভাগ্য যে, বিষয়টি হাইড হয়ে যাচ্ছে। আমরা নির্যাতিত সাংবাদিকদের মধ্যে ইউনিটি না থাকায় হাসিনা রেজিমের অপকর্মের সহযোগীরা প্রধানমন্ত্রীর দফতর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। এরচেয়ে দুঃখজনক আর কি হতে পারে? হত্যাকান্ডের শিকার ও নির্যাতিত সাংবাদিকদের একটা লিস্ট তৈরী করে তাদের ক্ষতিপুরণের ব্যবস্থা করা বর্তমান সরকারের গুরু দায়িত্ব।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট



















