দীর্ঘ প্রায় দুই বছর ধরে যুক্তরাজ্যে বিএনপির জোনাল কমিটি না থাকায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে যে হতাশা তৈরি হয়েছিল, তা এখন নতুন নেতৃত্ব গঠনের সম্ভাবনায় আশা ও প্রত্যাশায় রূপ নিতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন দলটির নেতা-কর্মীরা। আগামী সোমবার বার্মিংহামে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া যুক্তরাজ্য বিএনপির ১৬ জোনের প্রতিনিধি সভাকে ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে বিরাজ করছে ব্যাপক আলোচনা, জল্পনা-কল্পনা ও উত্তেজনা।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে একটি সম্ভাব্য খসড়া নেতৃত্ব তালিকা সংশ্লিষ্ট নেতাদের কাছে পৌঁছেছে। তবে শেষ পর্যন্ত প্রতিনিধি সভার মাধ্যমে নির্বাচিত নেতৃত্ব আসবে নাকি যুক্তরাজ্য বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তে নতুন কমিটি গঠিত হবে—সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যাবে সোমবারের প্রতিনিধি সভার পর।
সদস্য সংগ্রহে সক্রিয়দের নাম আলোচনায়
বিগত সময়ে যুক্তরাজ্য বিএনপির আহ্বানে সাড়া দিয়ে বার্মিংহাম ওয়েস্ট মিডল্যান্ড বিএনপির পক্ষ থেকে সৈয়দ জমশেদ আলী, আব্বাস মিয়া, কাজী আঙ্গুর মিয়া, জালাল উদ্দিন ও আওলাদ হোসেনের নেতৃত্বে ২৭৫টি সদস্য ফরম জমা দেওয়া হয়। অপরদিকে বার্মিংহাম সিটি বিএনপির আবজার হোসেন, আব্দুল কবির, রফিকুর রহমান রফু ও এমরান আহমেদের নেতৃত্বে ২১৩টি সদস্য ফরম এবং গুলজার আহমেদ ফয়ছল ও কয়ছর আলী শাহীনের নেতৃত্বে আরও প্রায় ১০০টির সদস্য ফরম জমা দেওয়া হয়।
দলীয় নেতাদের মতে, সদস্য সংগ্রহ ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে যাদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল, তাদের অনেকেই এবার নেতৃত্বের আলোচনায় রয়েছেন।
ওয়েস্ট মিডল্যান্ড বিএনপির সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়ে জোর আলোচনা
প্রতিনিধি সভাকে কেন্দ্র করে ওয়েস্ট মিডল্যান্ড বিএনপির সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। সভাপতি পদে সৈয়দ জমশেদ আলী, আব্বাস মিয়া, কাজী আঙ্গুর মিয়া, জালাল উদ্দিন ও আব্দুল খালিকের নাম আলোচনায় রয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এ পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেশ জমজমাট হতে পারে। অনেকেই নতুন নেতৃত্বের দিকে ঝুঁকছেন এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সমীকরণ পরিবর্তনের সম্ভাবনাও রয়েছে।
সাধারণ সম্পাদক পদে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন সদ্য বিলুপ্ত কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন। কমিটি বিলুপ্ত হওয়ার পরও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনায় সক্রিয় থাকায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ তার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
এছাড়া স্বেচ্ছাসেবক দল যুক্তরাজ্যের সহ-সভাপতি মজনু মিয়া এবং বিএনপি নেতা সারওয়ার আহমেদের নামও আলোচনায় রয়েছে। নেতাকর্মীদের মতে, তারাও সদ্য সাবেক কমিটির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিগত সরকারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন।
সাংগঠনিক সম্পাদক পদে বিএনপি নেতা মোহাম্মদ আলী, অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম এবং বিএনপি নেতা ও বার্মিংহাম ওয়েস্ট মিডল্যান্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মাদ ইসলাম উদ্দিন খানের নাম শোনা যাচ্ছে।
মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগে , সাংগঠনিক দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ পরিকল্পনার বিষয়গুলোকে সামনে রেখেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
তৃণমূল নেতাকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মোহাম্মাদ ইসলাম উদ্দিন খান ও অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলামের আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়।
দীর্ঘ সাংগঠনিক পথচলার ইতিহাস
দলীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালের মার্চ মাসে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। দীর্ঘ সময় পর ২০১৭ সালের ১৪ মার্চ ৭১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়।
তবে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের প্রায় এক বছর পর সাধারণ সম্পাদক আব্দুল খালিক দলীয় কার্যক্রম থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে ২০২২ সালে তিনি মূলধারার ব্রিটিশ রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার কারণ দেখিয়ে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ালে ওয়েস্ট মিডল্যান্ড বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেয়।
সে সময় বার্মিংহাম ওয়েস্ট মিডল্যান্ড বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি ও আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সভাপতি এম এ মালেক এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক কয়ছর এম আহমেদের নির্দেশে তিনি ২০২২ সাল থেকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন কমিটি বিলুপ্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত।
২০২৩ সালের ৪ এপ্রিল আকস্মিক এক ঘোষণায় যুক্তরাজ্যের সব জোনাল কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। তবে কমিটিগুলো বিলুপ্ত হওয়ার পরও সদ্য সাবেক সভাপতি সৈয়দ জমশেদ আলী ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেনের নেতৃত্বে সরকারবিরোধী আন্দোলন ও দলীয় বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে।
সদ্য সাবেক কমিটির সভাপতি সৈয়দ জমশেদ আলী বলেন,
“২০১৭ সালে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের এক বছরের মাথায় আমাদের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল খালিক দলীয় কার্যক্রম থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। এরপর আমি এবং যুগ্ম সম্পাদক আওলাদ হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রাম পরিচালনা করে আসছি।”
বার্মিংহাম সিটি বিএনপিতেও নেতৃত্ব নিয়ে ব্যাপক আলোচনা
বার্মিংহাম সিটি বিএনপির সভাপতি পদে এককভাবে এগিয়ে রয়েছেন সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবজার হোসেন। তাকে ঘিরে নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক ইতিবাচক আলোচনা রয়েছে। কর্মীবান্ধব ও সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় নেতা হিসেবে বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে তার ভূমিকা প্রশংসিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন নেতাকর্মীরা।
সিনিয়র সহ-সভাপতি পদে বার্মিংহাম ওয়েস্ট মিডল্যান্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা রফিকুর রহমান রফু এবং সাবেক সহ-সভাপতি পাখি মিয়ার নাম আলোচনায় রয়েছে।
সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন আন্দোলন-সংগ্রামের পরিচিত মুখ আব্দুল কবির, সাবেক যুগ্ম সম্পাদক এম. গুলজার আহমেদ ফয়ছল, সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমেদ, বার্মিংহাম সিটি স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক বাবরুল ইসলাম এবং সদস্য সচিব গোলাম মোস্তফা লিমন।
অন্যদিকে সাংগঠনিক সম্পাদক পদে সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি ওয়েস্ট মিডল্যান্ড যুবদলের লিটন আহমেদ এবং বিএনপি নেতা শামীম খান সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন।
তৃণমূলের প্রত্যাশা: মূল্যায়ন হোক ত্যাগী ও পরীক্ষিতদের
সার্বিকভাবে বার্মিংহাম সিটি ও ওয়েস্ট মিডল্যান্ড বিএনপির রাজনীতি এখন নতুন নেতৃত্বের প্রত্যাশায় উজ্জীবিত। তৃণমূল নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, বিশেষ করে আন্দোলন-সংগ্রামের কঠিন সময়ে যারা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন এবং দলের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তাদের মূল্যায়নের ভিত্তিতে নতুন কমিটিতে দায়িত্ব দেওয়া হবে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে এমন অনেকের নাম বিভিন্ন পদে প্রার্থী হিসেবে শোনা যাচ্ছে, যাদের অতীতে দলের কর্মসূচি কিংবা আন্দোলন-সংগ্রামে তেমন সক্রিয় দেখা যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতে, ত্যাগী, পরীক্ষিত ও মাঠপর্যায়ের নেতাদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী “সুপার ফাইভ” নেতৃত্ব গঠিত হলে দল আরও ঐক্যবদ্ধ, সুসংগঠিত ও শক্তিশালী হয়ে উঠবে এবং যুক্তরাজ্যে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমে নতুন গতি ফিরে আসবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক নেতা বলেন,
“বার্মিংহাম সিটি ও বার্মিংহাম ওয়েস্ট মিডল্যান্ড বিএনপির নেতৃত্বে আসতে এমন অনেকের নাম শোনা যাচ্ছে, যাদের বিগত আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে দেখা যায়নি। ৫ আগস্টের পর বিএনপিতে নতুন করে সুবিধাবাদী, হাইব্রিড ও অনুপ্রবেশকারীদের উত্থান ঘটেছে। অতীতে কোনো আন্দোলনে না থাকলেও অনেকে এখন বিএনপির পরিচয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তারাই বিভিন্ন স্থানে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন। বিষয়টি তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশার জন্ম দিয়েছে।”
প্রতিনিধি পাস বিতরণ নিয়েও বিতর্ক
প্রতিনিধি সভার পাস বিতরণ নিয়েও নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। একাধিক তৃণমূল নেতা অভিযোগ করেছেন, দীর্ঘদিন ধরে দলের জন্য কাজ করলেও অনেক কর্মী ও সমর্থক এখনো প্রতিনিধি পাস পাননি। ফলে তারা সভায় অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন।
তবে যুক্তরাজ্য বিএনপির নেতৃবৃন্দের দাবি, প্রতিনিধি সভার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি জোনাল কমিটির সদস্যপদ জমাদানকারী এবং বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় নেতাকর্মীদের মধ্য থেকেই প্রতিনিধি পাস ইস্যু করা হয়েছে, যাতে প্রকৃত কর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা যায়।
নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আশাবাদ
তৃণমূল নেতাকর্মীদের বিশ্বাস, আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ ও সদস্য সচিব খছরুজ্জামান খছরুর নেতৃত্বে যুক্তরাজ্য বিএনপি আরও শক্তিশালী ও সুসংগঠিত সংগঠনে পরিণত হবে। তাদের প্রত্যাশা, আসন্ন প্রতিনিধি সভার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য, যোগ্য ও ত্যাগী নেতৃত্ব উঠে আসবে, যা ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্যে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও শক্তিশালী করবে।
প্রকাশক ও সম্পাদক মোঃ বোরহান হাওলাদার জসিম, বার্তা সম্পাদক ,মোহাম্মদ জাকির মফস্বল সম্পাদক আ.স.ম. জুয়েল রানা
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১৬০, ফকিরের পোল গরম পানি গলি মতিঝিল ঢাকা ১০০০ । ম্পাদককর্তৃক শামীম প্রিন্টিং প্রেস,১৯৪/৫,ফকিরেরপুল থেকে মুদ্রিত,মতিঝিল ঢাকা ১০০০। মোবাইল নম্বরঃ ০১৮১৩২৭০৬৩৪ ইমেলঃ anatarmadhyam@gmail.com মেসার্স ন্যাশনাল সময়ের কন্ঠ কোম্পানি
Copyright © 2026 দৈনিক সময়ের কন্ঠ পত্রিকা . All rights reserved.