Dhaka ০৩:৪৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬

অকাল বন্যায় হাওরে ধান তলিয়ে, দিশেহারা নাসিরনগরের কৃষক

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রতিনিধি নয়ন আহমেদ বকুল
  • আপডেট টাইম : ০৮:১৫:৩০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ মে ২০২৬
  • / ৬৬ বার

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার হাওরাঞ্চলে কমপক্ষে তিন হাজার বিঘা জমির বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। স্বপ্নের সোনালী ফসল হারানোর আশঙ্কায় কৃষকদের মধ্যে নেমে এসেছে হতাশা আর অনিশ্চয়তা।
সরেজমিনে মেদির হাওর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, আগাম বানের পানিতে আধাপাকা ধান ডুবে আছে। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে পানির নিচ থেকে ধান কাটছেন। এজন্য প্রতিদিন ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা মজুরিতে শ্রমিক ভাড়া করতে হচ্ছে। তবে ডুবে থাকা ধানে ইতোমধ্যে পচন ধরতে শুরু করেছে, যা ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়াচ্ছে।মহাকাল পাড়ার কৃষক আবু লাল মিয়া জানান, তিনি ২০ কানি জমিতে ধান চাষ করেছিলেন। এর মধ্যে মাত্র পাঁচ কানি জমির ধান কাটতে পেরেছেন, বাকি ১৫ কানি এখনও পানির নিচে। উচ্চ সুদে দাদন নিয়ে চাষ করলেও এখন সেই দেনা পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি। “বছরে একটাই ফসল, সেটাই যদি নষ্ট হয়, তাহলে আমরা চলবো কীভাবে?”—আক্ষেপ তার কণ্ঠে।একই চিত্র শ্রীপুর গ্রামের কৃষক নারায়ণ দাসের ক্ষেতেও। চার কানি জমিতে লাগানো বিআর-২৯ জাতের ধান কাটার আগেই বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। তিনি বলেন, “আর দুই সপ্তাহ সময় পেলে ধান ঘরে তুলতে পারতাম। এখন পানির নিচ থেকে কেটে আনলেও লাভ নেই—এক মণ ধানের দাম ৬০০ টাকা, আর শ্রমিকের মজুরি ১৪০০ টাকা।”পশ্চিম পাড়া এলাকার কৃষক বাবুল মিয়ার ২০ বিঘা জমির ধান তলিয়ে গেছে। শ্রমিকের মজুরি ধানের দামের চেয়ে বেশি হওয়ায় তিনি ধান কাটতেও পারছেন না। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “সরকারি সহায়তা না পেলে আমরা না খেয়ে মরবো। কৃষি বিভাগ বা জনপ্রতিনিধিদের কাউকে পাশে পাচ্ছি না।”জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মোস্তফা এমরান হোসেন জানান, অকাল বন্যায় হাওরের প্রায় ৩০ শতাংশ জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে নতুন জাতের ধান চাষের কারণে সামগ্রিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রায় বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।অন্যদিকে সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক নুর আলী জানান, সরকার এ বছর ৩৬ টাকা কেজি দরে ১১ হাজার ৫৫ মেট্রিক টন ধান সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সংগ্রহ করবে, যা কৃষকদের কিছুটা সহায়তা দেবে।কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বোরো মৌসুমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় ১ লাখ ১১ হাজার ৭৭০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৯০ হাজার মেট্রিক টন, যার বাজার মূল্য প্রায় ১,৭৬৪ কোটি টাকা।তবে হাওরাঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি—পরিসংখ্যানের এই সাফল্যের আড়ালে তাদের দুর্দশা চাপা পড়ে যাচ্ছে। দ্রুত সরকারি সহায়তা না পেলে তারা চরম খাদ্যসংকট ও ঋণের বোঝায় পড়ে আরও বিপদে পড়বেন বলে আশঙ্কা করছেন।

Tag :

অকাল বন্যায় হাওরে ধান তলিয়ে, দিশেহারা নাসিরনগরের কৃষক

আপডেট টাইম : ০৮:১৫:৩০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ মে ২০২৬

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার হাওরাঞ্চলে কমপক্ষে তিন হাজার বিঘা জমির বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। স্বপ্নের সোনালী ফসল হারানোর আশঙ্কায় কৃষকদের মধ্যে নেমে এসেছে হতাশা আর অনিশ্চয়তা।
সরেজমিনে মেদির হাওর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, আগাম বানের পানিতে আধাপাকা ধান ডুবে আছে। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে পানির নিচ থেকে ধান কাটছেন। এজন্য প্রতিদিন ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা মজুরিতে শ্রমিক ভাড়া করতে হচ্ছে। তবে ডুবে থাকা ধানে ইতোমধ্যে পচন ধরতে শুরু করেছে, যা ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়াচ্ছে।মহাকাল পাড়ার কৃষক আবু লাল মিয়া জানান, তিনি ২০ কানি জমিতে ধান চাষ করেছিলেন। এর মধ্যে মাত্র পাঁচ কানি জমির ধান কাটতে পেরেছেন, বাকি ১৫ কানি এখনও পানির নিচে। উচ্চ সুদে দাদন নিয়ে চাষ করলেও এখন সেই দেনা পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি। “বছরে একটাই ফসল, সেটাই যদি নষ্ট হয়, তাহলে আমরা চলবো কীভাবে?”—আক্ষেপ তার কণ্ঠে।একই চিত্র শ্রীপুর গ্রামের কৃষক নারায়ণ দাসের ক্ষেতেও। চার কানি জমিতে লাগানো বিআর-২৯ জাতের ধান কাটার আগেই বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। তিনি বলেন, “আর দুই সপ্তাহ সময় পেলে ধান ঘরে তুলতে পারতাম। এখন পানির নিচ থেকে কেটে আনলেও লাভ নেই—এক মণ ধানের দাম ৬০০ টাকা, আর শ্রমিকের মজুরি ১৪০০ টাকা।”পশ্চিম পাড়া এলাকার কৃষক বাবুল মিয়ার ২০ বিঘা জমির ধান তলিয়ে গেছে। শ্রমিকের মজুরি ধানের দামের চেয়ে বেশি হওয়ায় তিনি ধান কাটতেও পারছেন না। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “সরকারি সহায়তা না পেলে আমরা না খেয়ে মরবো। কৃষি বিভাগ বা জনপ্রতিনিধিদের কাউকে পাশে পাচ্ছি না।”জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মোস্তফা এমরান হোসেন জানান, অকাল বন্যায় হাওরের প্রায় ৩০ শতাংশ জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে নতুন জাতের ধান চাষের কারণে সামগ্রিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রায় বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।অন্যদিকে সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক নুর আলী জানান, সরকার এ বছর ৩৬ টাকা কেজি দরে ১১ হাজার ৫৫ মেট্রিক টন ধান সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সংগ্রহ করবে, যা কৃষকদের কিছুটা সহায়তা দেবে।কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বোরো মৌসুমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় ১ লাখ ১১ হাজার ৭৭০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৯০ হাজার মেট্রিক টন, যার বাজার মূল্য প্রায় ১,৭৬৪ কোটি টাকা।তবে হাওরাঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি—পরিসংখ্যানের এই সাফল্যের আড়ালে তাদের দুর্দশা চাপা পড়ে যাচ্ছে। দ্রুত সরকারি সহায়তা না পেলে তারা চরম খাদ্যসংকট ও ঋণের বোঝায় পড়ে আরও বিপদে পড়বেন বলে আশঙ্কা করছেন।