বগুড়ার সপ্তপদী মার্কেট নামমাত্র ভাড়ায় চলছে দোকান, রাজস্ববঞ্চিত পৌরসভা
- আপডেট টাইম : ১১:৫৮:২০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬
- / ৮ ০০০. ০০ বার

বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথায় অর্ধশতাব্দী আগে গড়ে ওঠা পৌরসভার একমাত্র মার্কেট জরাজীর্ণ হলেও চলছে ব্যবসা-বাণিজ্য। চুক্তি ছাড়াই নামমাত্র ভাড়ায় নিয়ে ব্যবসায়ীরা সাবলেট দিয়ে সামনে দোকান বসিয়ে লাখ লাখ টাকা আয় করলেও পৌরসভার রাজস্ব খাতে কোনো অর্থই জমা হচ্ছে না।
বিষয়টি চলছে বছরের পর বছর। এতে রাজস্ববঞ্চিত থাকছে পৌরসভা। আর বহুগুণ লাভ হাতিয়ে নিচ্ছেন দোকান মালিকেরা। মার্কেটে চলাচলে কষ্ট ভোগ করছেন পথচারী ও ক্রেতারা।
জানা গেছে, প্রতিটি দোকানের সামনেই দুটি করে স্টল ভাড়া দিয়েছেন মালিকেরা। এই মালিকেরা আবার সাবলেট ভাড়াটিয়া। বগুড়া পৌরসভা এই মার্কেটের দেড় শতাধিক দোকানের ভাড়া ঠিকমতো পায় না। অর্ধেক রয়েছে রেন্ট কন্ট্রোল বা আদালতে জমা। দোকান মালিকেরা প্রতি স্কয়ারফিটে কেউ ১৭ টাকা আবার কেউ সাত টাকা ভাড়া দেন। যারা আদালতে ভাড়া দেন, তারা বহগুণ বেশি টাকা নিয়ে সাবলেট দিয়েছে। এতে ফাঁকিতে পড়ছে পৌরসভা।
বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের আমলে মার্কেট ভবনটি ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ বহুদূর এগোলেও অজ্ঞাত কারণে বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে বগুড়া সিটি করপোরেশনে উন্নীত হওয়ায় এ মার্কেটটির উন্নয়ন চায় বগুড়াবাসী। পাশাপাশি শুভংকরের ফাঁকি থেকেও আয় বাড়াতে চায় সিটি করপোরেশন।
সূত্র জানায়, বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্রের সপ্তপদী মার্কেটটি ২৩ শতাংশ জমির ওপর। স্বাধীনতার আগে ১৯৬৮ সালে সামনের অংশের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। স্বাধীনতাযুদ্ধের পর মার্কেটটির দোকান নামমাত্র মূল্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এরপর ১৯৭৪ সালে পেছনের অংশে আবার নির্মাণ কাজ শুরু হলে তিনতলা ভবনে দেড় শতাধিক দোকান ও অগ্রণী অফিস ভাড়া দেওয়া হয়। ১৯৮৫ সালে তৎকালীন পৌরসভার চেয়ারম্যান জহুরুল ইসলাম প্রতি স্কয়ার ফুট ৫০ পয়সা করে ১৫ বছরের জন্য চুক্তিনামা করে। এরপর ২০০৪ সালে মাহবুবুর রহমান পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলে আয় বৃদ্ধির জন্য তিনি বরাদ্দকৃতদের নোটিস দেন। তখন প্রতি স্কয়ার ফুট সাত টাকা করা হয়। এরপর দ্বিতীয় দফায় ’১৫ সালে ভাড়া বাড়িয়ে নতুন চুক্তি করতে বলেন। তখন দোকান মালিকরা আন্দোলন করেন। ওই সময় অর্ধেক দোকান মালিক ১৭ টাকা মেনে নিলেও বাকি দোকানের মালিকরা আদালতের শরণাপন্ন হন। তারা আদালতে আগের ভাড়াই দিচ্ছেন।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, দেড় শতাধিক দোকানের মধ্যে ১৩৮টি দোকানেই সাবলেট রয়েছে। ২০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রতিটি দোকানের ভাড়া নিচ্ছেন তারা। এরপরেও সাবলেট মালিকরা দোকানের সামনের অংশেও টেবিল-চেয়ার দিয়ে বসিয়েছে ভ্রাম্যমাণ দোকান। সেখানে প্রতিটি দোকান থেকেও আয় হয় মাসে ১০-২০ হাজার টাকা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দোকানি বলেন, ‘আমি দোকানের সামনে মোবাইল ঠিক করার দোকান দিয়েছি। প্রতি মাসে ১৫ হাজার টাকা মালিককে দিতে হয়।
মার্কেটে লাকি ফটোস্ট্যাটের মালিক ঠান্ডুর দুটি দোকান রয়েছে। তিনি বলেন, আমি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছি। ভাড়ার কথাটি তিনি এড়িয়ে যান। নিচতলায় ৫৫টি দোকান রয়েছে। এর সামনে ৮০টি দোকান বসিয়ে ভাড়া দিয়েছেন মালিকরা। দোতলার অবস্থা একই। এখানে দোকানের সামনে চলছে আরেক ব্যবসা।’
দুর্দিন যাচ্ছে পিরোজপুরের শাঁখাশিল্পীদেরদুর্দিন যাচ্ছে পিরোজপুরের শাঁখাশিল্পীদের
মার্কেটের রুনা মানি চেঞ্জারের মালিক জাহিদুর রহমান জাদু বলেন, ‘আমি আদালতে ভাড়া দেই না, পৌরসভাতেই দেই।’ অর্ধেক ভাড়া আদালতে দেওয়া হয় স্বীকার করে তিনি বলেন, প্রতিটি দোকানের সামনেই মালিকরা আলাদা করে ভ্রাম্যমাণ দোকান বসিয়েছেন। সেটির টাকা মালিকরা তুলছেন। অধিকাংশ দোকান এখন সাবলেটে রয়েছে।
মার্কেটের সাধারণ সম্পাদক রাশেদুর রহমান আমার দেশকে বলেন, এখন ১৩৮টি দোকান পুরোপুরি চালু রয়েছে। সাবলেট ও দোকানের সামনের অংশ আলাদা ভাড়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি নিয়ে বার বার কথা হলেও কেউ মানেনি। মার্কেটের গার্ড লিটন, প্রফুল্ল ও লতিফ মার্কেটের টাকা তোলে এবং আদালতে জমা দেন। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছু পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছি।
বগুড়া পৌরসভার সাবেক মেয়র মাহবুবুর রহমান বলেন, আমি চেষ্টা করে ৫০ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ১৭ টাকা করেছিলাম। কিছু সাত টাকায় আছে— এরাই আদালতে টাকা জমা দেয়। ২০১৮ সালে এই মার্কেট নিয়ে মালিকদের সঙ্গে চুক্তির কথা থাকলেও তারা আদালতের শরণাপন্ন হন। বর্তমান বাজারমূল্যে শহরের প্রাণকেন্দ্র সাত মাথায় প্রতি স্কয়ার ফুটে বহুগুণ ভাড়া হলেও পৌরসভা সেটা থেকে বঞ্চিত। এখান থেকে কোনো উল্লেখযোগ্য আয় পৌরসভার নেই।
তিনি বলেন, ২০১৮ সালে এই মার্কেট পরিত্যক্ত করার বিষয়ে সভা হলেও পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়নি। মার্কেটটি সম্প্রসারণ বা নতুন ভবন নির্মাণ করে বরাদ্দ দিলে বহুগুণ লাভ পাবে বগুড়া সিটি করপোরেশন।
দুই বছর আগে মার্কেটের একটি কার্নিশ ভেঙে পথচারির ওপর পড়লে তিন মারা যান। মার্কেটের বিভিন্ন অংশে অনেকটাই জরাজীর্ণ হয়ে গেছে। তাছাড়া মার্কেটের পুরো অংশজুড়েই রয়েছে দোকানের মধ্যে দোকান। ফলে পথচারি বা মার্কেটে যাওয়া ক্রেতাদের নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। মার্কেটের বাইরে ফুটপাত যেমন দখলে, তেমনি ভিতরেও একই অবস্থা।
সূত্র জানায়, বগুড়া-৬ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা যখন ২০২৩ সালে পৌর মেয়র ছিলেন, তখন ১০ তলা ভবনের নকশা ও নির্মাণের কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু ‘বগুড়া’ হওয়ায় তা বন্ধ হয়ে যায়। ওই সময়কার কাউন্সিলর এরশাদুল বারী এরশাদ জানান, ১০ তলা ভবনের জন্য ডিজাইন ও এস্টিমেট কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছিল।
নবসৃষ্ট বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন আমার দেশকে বলেন, আমরা সিটি করপোরেশনের আয়-ব্যয় নিয়ে কাজ করছি। মার্কেটের ভাড়ার বিষয়টি সম্পর্কে জেনেছি। খুব দ্রুত বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করা হবে। বগুড়ার উন্নয়নের স্বার্থে যে কোনো ভালো কাজ আমরা করে যাব।


















