Dhaka ০৫:৫০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কুমিল্লায় স্কুলছাত্রী জান্নাত হত্যা: ধর্ষণ ও শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগ, চট্টগ্রাম থেকে সিএনজিচালক সুমন গ্রেপ্তার অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের বিবরণ, আসামির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উদ্ধার নিহতের আইফোন

আলমগীর হোসেন আলম কুমিল্লা জেলা ব্যুরো চিফ দৈনিক সময়ের কণ্ঠ
  • আপডেট টাইম : ১২:০৬:৩৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
  • / ১৪৫ ০০০.০০.বার দেখেছেন

কুমিল্লার লালমাইয়ে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনকে (১৫) ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেছে পুলিশ। চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অভিযুক্ত সিএনজিচালক সুমন মিয়াকে (৩৫) চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উদ্ধার করা হয়েছে নিহত শিক্ষার্থীর ব্যবহৃত আইফোন। শনিবার (১০ অক্টোবর) অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের সংবাদ সম্মেলন ও জেলা পুলিশের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হয়।
ঘটনাটি কুমিল্লাজুড়ে উদ্বেগ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। একজন কিশোরী শিক্ষার্থীর এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে জননিরাপত্তা, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ এবং অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে।
ধানক্ষেতের আইলে মিলল শিক্ষার্থীর মরদেহ
পুলিশের প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গত ৮ অক্টোবর সকালে লালমাই উপজেলার ভোরাজগৎপুর উত্তরপাড়া গ্রামের একটি ধানক্ষেতের আইলের পাশে এক কিশোরীর মরদেহ পড়ে থাকার খবর জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে পুলিশের কাছে পৌঁছায়। পরে লালমাই থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আইনগত কার্যক্রম শুরু করে। নিহতের বাবা মরদেহ শনাক্ত করেন।
নিহত জান্নাতুল তাজমিনের স্থায়ী বাড়ি যশোর জেলায়। বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় বসবাস করতেন তিনি। নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন জান্নাত।
বাসায় ফেরার পথে সিএনজি অটোরিকশায় ওঠেন জান্নাত
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ৮ অক্টোবর রাত আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে নগরীর পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকার তিশা বাস কাউন্টারের সামনে থেকে বাসায় ফেরার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করেন জান্নাত। চালক সুমন মিয়ার সঙ্গে ৩০০ টাকায় ভাড়া ঠিক হয়।
পুলিশের দাবি, যাত্রাপথে জান্নাত চালককে ১০০ টাকা দিয়ে কলা ও রুটি কিনে আনেন। এরপর সংক্ষিপ্ত পথে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে চালক নির্ধারিত পথ পরিবর্তন করেন। নূরজাহান হোটেলের সামনে থেকে ইউটার্ন নিয়ে চাঁদপুরগামী সড়ক ধরে বিজরা বাজার হয়ে তাঁকে নির্জন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয় বলে পুলিশের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
পালানোর চেষ্টা, ধর্ষণ ও শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগ
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নির্জন স্থানে অটোরিকশা থামানোর পর জান্নাত বুঝতে পারেন, তিনি বাসায় ফেরার পথে নেই। এ সময় তিনি ভয় পেয়ে অটোরিকশা থেকে নেমে পালানোর চেষ্টা করেন। পুলিশের দাবি, তখন তাঁকে আটকে অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থের চেষ্টা করা হলে তিনি চিৎকার করেন। একপর্যায়ে চালক তাঁর গলায় গামছা পেঁচিয়ে ধরেন।
পুলিশের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আরও দাবি করা হয়, জিজ্ঞাসাবাদে সুমন জান্নাতকে ধর্ষণ এবং পরে ধানক্ষেতে নিয়ে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করার কথা স্বীকার করেছেন। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।
আইফোন নিয়ে পালিয়ে চট্টগ্রামে
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর জান্নাতের হাতব্যাগ থেকে তাঁর ব্যবহৃত আইফোন নিয়ে ব্যাগটি ধানক্ষেতে ফেলে দেন অভিযুক্ত। পরে ঘটনাস্থলে অটোরিকশা রেখে কাচিকাটা মসজিদের সামনে একটি পুকুরে গোসল করেন। এরপর অন্য একটি ভাড়ার সিএনজিতে করে বাখরাবাদ এলাকায় যান। সেখানে একটি পুকুরের পাড়ের জঙ্গলে আইফোনটি লুকিয়ে রেখে চট্টগ্রামে চলে যান বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ডিবি ও থানা পুলিশের যৌথ তদন্ত
জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ৯ অক্টোবর চট্টগ্রাম থেকে সুমন মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁর দেওয়া তথ্য ও দেখানো মতে বাখরাবাদ এলাকার একটি পুকুরের পাড়ের জঙ্গল থেকে জান্নাতের ব্যবহৃত আইফোন উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় লালমাই থানায় হত্যা মামলা হয়েছে। মামলার রহস্য উদ্ঘাটনে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও থানা পুলিশ যৌথভাবে কাজ করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় পরিবার ও এলাকাবাসী
১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এমন নৃশংসতার অভিযোগে স্থানীয় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
একই সঙ্গে তদন্তের স্বচ্ছতা বজায় রাখা, উদ্ধার করা আলামত যথাযথভাবে পরীক্ষা করা এবং আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা জরুরি। জান্নাত হত্যার ঘটনায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে মামলার পরবর্তী অগ্রগতি ও বিচারিক কার্যক্রমের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন স্বজন ও সচেতন মহল।
তথ্যসূত্র: কুমিল্লা জেলা পুলিশের পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের প্রেস বিজ্ঞপ্তি, ১০ অক্টোবর ২০২৬; অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের সংবাদ সম্মেলন।

জাতীয় নিউজ

Please Share This Post in Your Social Media