ফিরে দেখা জুলাই বিপ্লব অভ্যুত্থানের পর সরকারবিহীন টালমাটাল তিনদিন
- আপডেট টাইম : ১১:৪৮:১২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৭ অগাস্ট ২০২৬
- / ৫২ ০০০ বার

ছবি: সংগৃহীত
চব্বিশের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পরের তিনদিন বাংলাদেশ ছিল সরকারবিহীন। শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পালিয়ে যান তার সরকারের মন্ত্রিসভার সব সদস্য, অবৈধ ‘আমি-ডামি’ সংসদের ৩৫০ সংসদ সদস্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন সব দলবাজ কর্মকর্তা, শেখ হাসিনার আস্থাভাজন শীর্ষস্থানীয় আমলা, উচ্চ আদালতের দলদাস বিচারপতি থেকে শুরু করে প্রায় সবাই। পৃথিবীর দেশে দেশে স্বৈরশাসকের পতন ও পলায়নের উদাহরণ থাকলেও প্রধানমন্ত্রী থেকে জাতীয় মসজিদের খতিব পর্যন্ত পালিয়ে যাওয়ার দৃষ্টান্ত বিরল।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী ৬, ৭ ও ৮ আগস্ট দেশে কোনো সরকারপ্রধান ছিল না। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায়ও নানামুখী চ্যালেঞ্জ ছিল। সরকারপ্রধান হিসেবে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিকল্প সে সময় ছিল না বললেই চলে। তার বৈশ্বিক প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা এক্ষেত্রে গুরুত্ব পায়। ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, ড. সালেহ উদ্দিন আহমদ ও ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদের নাম প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে প্রস্তাবে এলেও ড. ইউনূসের নাম প্রস্তাবের পর সেগুলো গুরুত্ব পায়ন
বিপ্লবের পর প্রতিবিপ্লবের ঝুঁকি, প্রতিবেশী দেশের চক্রান্ত, লুটেরা অলিগার্ক ও শেখ হাসিনার সুবিধাভোগীদের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টার মধ্যে শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাই ছিল অগ্রাধিকার। অভ্যুত্থানের পক্ষের বিভিন্ন দল ও শক্তিকে তুষ্ট করে সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ চূড়ান্ত করতেও বেশ বেগ পেতে হয়। পলাতক প্রধানমন্ত্রীর অনুগত রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করতে হয়।
৮ আগস্ট রাত সাড়ে ৯টায় দেশ তিনদিন সরকারবিহীন থাকার পর বঙ্গভবনের দরবার হলে ৮৪ বছর বয়সি নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার ১৩ জন উপদেষ্টাকে শপথবাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। এর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়, যা পরবর্তী সময়ে ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে।
যেভাবে ড. ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট অভ্যুত্থানের পর ৬ আগস্টই নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়। দিনভর নানা জল্পনা-কল্পনা ও অস্থির সময় পার করে রাতে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে তিন বাহিনীর প্রধান ও ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। অবশ্য শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর ৫ আগস্ট সন্ধ্যায় ছাত্রনেতারা আগের যোগাযোগের ধারাবাহিকতায় ড. ইউনূসের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। সেদিনই প্রথম ড. ইউনূস প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দেন। এরপর কয়েক ঘণ্টা ধরে আরো আলোচনার পর তিনি রাজি হন।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের ১৫ সদস্যের একটি দল ৬ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টায় বঙ্গভবনে যায়। এর দেড় ঘণ্টা পর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বঙ্গভবনে প্রবেশ করেন তিন বাহিনীর প্রধানরা। বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তিন বাহিনীর প্রধান ও ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের দীর্ঘ বৈঠকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত হয়।
বৈঠক শেষে রাত সোয়া ১২টার দিকে বঙ্গভবন থেকে বেরিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের পক্ষে সেখানে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, তারা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম প্রস্তাব করেছেন। রাষ্ট্রপতি তাতে সম্মতি দিয়েছেন। এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের বাকি সদস্য কারা হবেন, সে বিষয়ে ১৫ জনের নামের একটি তালিকা তারা দিয়েছেন, যেখানে নাগরিক সমাজসহ ছাত্র প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ তালিকা নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে এটি চূড়ান্ত হবে। নাহিদ ইসলাম আশা প্রকাশ করে জানান, পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা বা দ্রুততম সময়ের মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার চূড়ান্ত হবে।
এ সময় নাহিদ ইসলামের সঙ্গে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক (পরে আইন উপদেষ্টা) আসিফ নজরুল সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এ সরকার গঠন করতে যাচ্ছি। এ সময়ে এটাকে বিভিন্নভাবে সাংবিধানিক বৈধতা দেওয়ার সুযোগ আছে, নিয়ম আছে। সেটা অনুসরণ করা হবে। সরকারের মেয়াদ এখনো ঠিক করা হয়নি।’
তার আগে ৬ আগস্ট ভোরে এক ভিডিও বার্তার মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম প্রস্তাব করেছিলেন ছাত্র আন্দোলনের নেতারা।
এদিকে, ৭ আগস্ট প্যারিস থেকে দেশে ফিরে ড. মুহাম্মদ ইউনূস দেশব্যাপী ভাঙচুর ও নৈরাজ্য বন্ধে বিবৃতি দেন। বিবৃতিতে তিনি ভুলের কারণে ছাত্র-জনতার বিজয় যেন হাতছাড়া না হয়ে যায়, সে বিষয়ে সতর্ক করেন। ইউনূস সেন্টার থেকে দেশবাসীর উদ্দেশে দেওয়া বার্তায় আরো বলা হয়, ‘আমি সাহসী ছাত্রদের অভিনন্দন জানাই, যারা আমাদের দ্বিতীয় বিজয় দিবসকে বাস্তবে রূপ দিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং অভিনন্দন জানাই দেশের আপামর জনসাধারণকে, যারা ছাত্রদের এ আন্দোলনে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছেন।’
গণঅভ্যুত্থানের এক দিনের মাথায় ৭ আগস্ট শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগের মামলা থেকে খালাস পান গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান ও নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ চারজন। শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের ভারপ্রাপ্ত বিচারক এমএ আওয়াল ওই দিন মামলার রায় দেন। মামলা থেকে খালাস পাওয়া অপর তিনজন হলেন—গ্রামীণ টেলিকমের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আশরাফুল হাসান, পরিচালক নুর জাহান বেগম ও মো. শাহজাহান।
২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি ড. ইউনূসসহ চারজনকে ছয় মাস করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয় ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালত। মামলা থেকে খালাস চেয়ে ২৮ জানুয়ারি আপিল করেন ড. ইউনূসসহ চারজন।
দ্বাদশ সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়
রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন ৬ আগস্ট দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেন। ওই দিন বঙ্গভবনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তিন বাহিনীর প্রধান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের সমন্বয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে সংসদ বিলুপ্ত করা হয়েছে।
মুক্ত হন খালেদা জিয়া
৬ আগস্টই তৎকালীন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে নির্বাহী আদেশে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। ওই দিন বঙ্গভবনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়ার কথা জানানো হয়।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে তিন বাহিনীর প্রধান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের বৈঠকের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
কথিত দুর্নীতির দুই মামলায় খালেদা জিয়াকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। দুই বছরের বেশি সময় তিনি কারাবন্দি ছিলেন। ২০২০ সালের ২৫ মার্চ নির্বাহী আদেশে তার সাজা স্থগিত করে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেয় সরকার। এরপর ছয় মাস পরপর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তার সাজা স্থগিত করে মুক্তির মেয়াদ বাড়াচ্ছিল সরকার। শর্তসাপেক্ষে দেওয়া ওই মুক্তিতে তিনি কার্যত গৃহবন্দি ছিলেন। বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দিচ্ছিল না হাসিনা সরকার। অভ্যুত্থানের পরই তিনি পুরোপুরি মুক্তি পান।
এছাড়া ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও বিভিন্ন মামলায় আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দেওয়া শুরু হয়েছে বলে বঙ্গভবনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়। এতে আরো বলা হয়, ইতোমধ্যে অনেকে মুক্তি পেয়েছেন। বিশেষ করে বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও রিজভী আহমেদসহ অনেকেই ৬ আগস্টই কারাগার থেকে মুক্তি পান।
দেশে শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ৭ আগস্ট নয়াপল্টনে বিএনপি সমাবেশের আয়োজন করে। সেখানে এভারকেয়ার হাসপাতালের কেবিন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে দলের চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দেশবাসীর প্রতি শান্তির বার্তা দেন। ধ্বংস, প্রতিশোধ, প্রতিহিংসা নয়; ভালোবাসা ও শান্তির সমাজ গড়ে তোলার আহ্বান জানান খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, তরুণরা যে স্বপ্ন নিয়ে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছেন, সে স্বপ্ন বাস্তবায়নে মেধা, যোগ্যতা ও জ্ঞানভিত্তিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।
লন্ডনে নির্বাসিত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধান অতিথি হিসেবে ওই সমাবেশে বক্তব্য দেন।
সচিবালয়ে ভয়-আতঙ্ক, ফাঁকা
প্রবল গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ও পলায়নের পরদিনই বদলে যায় প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়সহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের দেড় দশকের চেনা রূপ। ভয়-শঙ্কা নিয়ে সচিবালয়ে হাজিরা দেন অনেকে। অনেকে আবার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে গরহাজির থাকেন। ফলে ৬ আগস্ট সচিবালয়ে কোনো কাজ হয়নি; বরং গুজব-আতঙ্কের কারণে দুপুর ১২টার মধ্যে অফিস ছাড়েন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাদের আশঙ্কা ছিল, অভ্যুত্থানকারী ছাত্ররা সচিবালয়ে ঢুকে আওয়ামী দলবাজ কর্মকর্তাদের শায়েস্তা করবে।
অভ্যুত্থানের পরদিন সকালেই সরিয়ে ফেলা হয় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের নামফলক। নামানো হয় শেখ হাসিনার ছবি। বিভিন্ন দেয়াল থেকে শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার ছবিসহ অন্যান্য ব্যানার-ফেস্টুনও সরিয়ে ফেলা হয়। হাসিনার শাসনে বঞ্চিত দাবিদার কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে তাদের সভাও করতে দেখা যায়।
শুধু সচিবালয় নয়, সরকারি অন্যান্য দপ্তরেও কমবেশি একই চিত্র ছিল। পুলিশ সদর দপ্তরে ৫ আগস্ট ভাঙচুরের পর ৬ আগস্ট সেখানে যাননি পুলিশের কোনো কর্মকর্তা। তবে নিম্ন আদালতে বিভিন্ন মামলার শুনানি হয় এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলের কারাবন্দি নেতাদের অনেকের গণজামিন হয় ওই দিন।
এদিকে, অভ্যুত্থানের একদিন পর ৭ আগস্ট প্রশাসন, আইন ও শিক্ষাক্ষেত্রের উচ্চপদস্থ অনেকে পদত্যাগ করেন। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষপদেও রদবদল হতে থাকে। পদত্যাগী ও অব্যাহতি দেওয়া কর্মকর্তাদের কেউ কেউ শেখ হাসিনা সরকারের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া ছিলেন। এছাড়া দলীয় বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্তরাও ছিলেন। ওই দিন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়ার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে সরকার। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল পদ থেকে এএম আমিন উদ্দিন ব্যক্তিগত অসুবিধার কারণ উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বরাবর পদত্যাগপত্র দেন। অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ মোহাম্মদ মোরশেদও রাষ্ট্রপতি বরাবর অব্যাহতিপত্র দেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নূরুল আলম পদত্যাগ করেন ওই দিন।
পুলিশশূন্য থানা
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) আওতাধীন ৫০ থানার মধ্যে বেশিরভাগই অভ্যুত্থানের পরদিন পুলিশশূন্য ছিল। শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ঘোষণা আসার পর থেকেই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় থানা ভবনে বিক্ষুব্ধ জনতার হামলা শুরু হয়। কোথাও আগুন দেওয়া হয়, কোথাও ভাঙচুর করা হয়। পুড়িয়ে দেওয়া হয় থানা-পুলিশের কাজে ব্যবহৃত গাড়ি। মামলার আলামত হিসেবে বিভিন্ন থানা চত্বরে থাকা গাড়িও পোড়ানো হয়। বিভিন্ন থানায় বিক্ষুব্ধ জনতার হামলায় পুলিশের বেশ কয়েকজন সদস্যের মৃত্যু হয়।
কেবল থানা নয়, পুলিশ সদর দপ্তরসহ বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের কার্যালয়েও হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ওই সব ঘটনায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বেশিরভাগ থানার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। থানা তো বটেই পুলিশ সদর দপ্তর ও মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়েও কাউকে পাওয়া যায়নি অভ্যুত্থানের পরদিন।
পরে জানা গিয়েছিল, অভ্যুত্থান-পূর্বাপর সহিংস ঘটনা ও জনরোষে ৪৪ পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। বিভিন্ন থানা ও পুলিশের স্থাপনায় হামলার ঘটনায় নিহত সদস্যদের বেশিরভাগই কনস্টেবল, নায়েক, সহকারী উপপরিদর্শক ও উপপরিদর্শক পদমর্যাদার কর্মকর্তা। নিহত ব্যক্তিদের সহকর্মী ও স্বজনদের অভিযোগ, যখন স্থাপনাগুলোয় হামলা হচ্ছিল, তখন ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তাকে তারা পাশে পাননি। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বেশিরভাগই পরিস্থিতি বুঝতে পেরে অধস্তনদের রেখে আগেভাগেই পালিয়ে যান।
নব্য চাঁদাবাজদের হাতে জিম্মি রাজধানীবাসী, বাড়ছে হত্যানব্য-চাঁদাবাজদের-হাতে-জিম্মি-রাজধানীবাসী,-বাড়ছে-হত্যা
নতুন আইজিপি নিয়োগ
সরকারবিহীন দেশে ৬ আগস্টে ময়নুল ইসলামকে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি পুলিশের ট্রাফিক অ্যান্ড ড্রাইভিং স্কুলের কমান্ড্যান্টের (অতিরিক্ত আইজিপি) দায়িত্বে ছিলেন। ৬ আগস্ট রাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের প্রজ্ঞাপনে নতুন আইজিপি নিয়োগের কথা জানানো হয়। এর আগে আইজিপি পদে চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
সেনাবাহিনীর উচ্চপর্যায়ে রদবদল
ক্যান্টনমেন্টে স্থিতিশীলতা আনতে অভ্যুত্থানের পরদিন ৬ আগস্টই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শীর্ষস্থানীয় পদে রদবদল করা হয়। ওই দিন গুম-খুনের হোতা মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়ে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ৬ আগস্ট এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এসব পদক্ষেপের কথা জানিয়ে দেয়।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাইফুল আলমের চাকরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে, লেফটেন্যান্ট জেনারেল মজিবুর রহমানকে জিওসি আর্মি ট্রেনিং অ্যান্ড ডকট্রিন কমান্ড, লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহম্মদ তাবরেজ শামস চৌধুরীকে সেনাবাহিনীর কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল, লেফটেন্যান্ট জেনারেল মিজানুর রহমান শামীমকে সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ, লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ শাহীনুল হককে কমান্ড্যান্ট এনডিসি এবং মেজর জেনারেল আ স ম রিদওয়ানুর রহমানকে এনটিএমসির মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় ওই দিন।
অকুণ্ঠ আন্তর্জাতিক সমর্থন
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সঙ্গে সঙ্গেই আন্তর্জাতিক মহল অকুণ্ঠ সমর্থন জানায়। বাংলাদেশে একটি শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের আহ্বান জানান জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। ৫ আগস্ট রাতেই জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র ফারহান হক এ তথ্য জানান। ফারহান হক আরো বলেন, বাংলাদেশে সহিংসতার সব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ, স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব।
বাংলাদেশের সব পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানায় পশ্চিমা দেশগুলো। একই সঙ্গে তারা গণতান্ত্রিক উত্তরণের আহ্বান জানায়।
ওয়াশিংটন বাংলাদেশের জনগণের পাশে রয়েছে এবং নতুন করে সহিংসতা থেকে বিরত থাকতে সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানায় যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার এসব কথা বলেন। মুখপাত্র আরো বলেন, ‘আমরা গণতান্ত্রিক শাসন দেখতে চাই। আমরা চাই বাংলাদেশের জনগণ তাদের সরকার ঠিক করবেন। এ বিষয়ে আগামী দিন ও সপ্তাহগুলোয় আমরা নজর রাখব।’
ব্রিফিংয়ে অন্তর্বর্তী সরকার প্রসঙ্গে মিলার বলেন, এক্ষেত্রে জনগণের গণতান্ত্রিক প্রত্যাশার প্রতিফলন ও একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করার বিষয়ে তারা জোর দিচ্ছেন এবং এটি গুরুত্বপূর্ণ।
আট বছর পর বাড়ি ফেরেন আযমী ও আরমান
শেখ হাসিনার পতনের পরদিনই আয়নাঘর ঘেরাও করেন গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা। ৬ আগস্টে আট বছর পর বন্দিশালা আয়নাঘর থেকে মুক্তি পান সাবেক সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী এবং মীর কাসেম আলীর ছেলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আহমাদ বিন কাসেম (আরমান)। ওই দিন ভোরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয় নির্জন এলাকায়। পরে তারা নিজ নিজ বাসায় ফেরেন।
থমথমে রাজধানীর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে শিক্ষার্থীরা
শেখ হাসিনার পতন ও দেশত্যাগের পর কারফিউ তুলে নিয়ে অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হলেও ৬ আগস্ট রাজধানীর পরিস্থিতি ছিল থমথমে। জীবনযাত্রা ছিল মন্থর। সড়কগুলোয় যান চলাচল ছিল কম। লোকজনও তেমন একটা ছিল না। পুলিশ না থাকায় মোড়ে মোড়ে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের।
আন্দোলনে বিজয় অর্জনের আনন্দে দ্বিতীয় দিনেও ছাত্র-জনতা ছিল উদ্বেলিত । ৬ আগস্ট সকাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, গণভবন ও ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় অসংখ্য মানুষকে সমবেত হতে দেখা যায়। কর্মবিরতি পালন করায় পুলিশ বাহিনীর কোনো সদস্যকে দেখা যায়নি। সড়কে যানবাহনের সংখ্যা ছিল কম। হাতেগোনা কিছু বাস চলাচল করে। অটোরিকশা ও ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলের সংখ্যাও ছিল কম। দিনের প্রথম ভাগে সড়কে ব্যক্তিগত গাড়ি প্রায় দেখাই যায়নি। তবে দুপুরের পর থেকে কিছু ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল করতে দেখা যায়। রিকশাই ছিল প্রধান যানবাহন।
দিনের প্রথম ভাগে যানবাহনের সংখ্যা কম থাকায় সড়কগুলোয় তেমন যানজট ছিল না। তবে দুপুর থেকে যানবাহনের সংখ্যা ক্রমেই বাড়তে থাকে। ট্রাফিক পুলিশ না থাকায় অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ সড়কের মোড়ে যানবাহন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করেন শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীরা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কোনো ফ্যাসিস্ট পালিয়ে যাচ্ছে কি না সেটা দেখতে সন্দেহজনক অনেক যানবাহনে তল্লাশিও চালান। অর্থ ও নথি নিয়ে পালানোর সময় শেখ হাসিনার একাধিক সহযোগী শিক্ষার্থীদের হাতে আটকও হন।
কারা বিদ্রোহ, বহু বন্দির পলায়ন
অভ্যুত্থানের পর সরকারবিহীন সময়ে দেশের বিভিন্ন কারাগারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছিল। ৭ আগস্ট গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে বেরিয়ে যান ২০৯ বন্দি। কারাগার থেকে বের হতে গিয়ে কারারক্ষীদের গুলিতে ওই দিন ছয়জন নিহতও হন। এছাড়া কুষ্টিয়া জেলা কারাগার থেকেও কমপক্ষে ৯৪ বন্দি পালিয়ে যান। সিরাজগঞ্জ কারাগার থেকেও কয়েকজন বন্দি পালানোর চেষ্টা করেন। খবর পাওয়ার পরপরই এই তিন কারাগারে সেনাসদস্যরা উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। আর সাতক্ষীরা কারাগার থেকে আগে পালিয়ে যাওয়া ৪১০ বন্দি ফিরে আসেন।
















