Dhaka ০১:২১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রবাসী কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে স্ত্রী নির্যাতনের অভিযোগ; ১৫ হাজার টাকা নিয়ে গোপনে তালাকের কাগজ তৈরি ও কাবিননামার কপি দিতে ৬ হাজার টাকা চাওয়ার অভিযোগও সামনে

বিশেষ অনুসন্ধান
  • আপডেট টাইম : ০৮:৫৫:০৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
  • / ২০১ ০০০.০০.বার দেখেছেন

নন্দীপাড়ায় কাজী নাসির হোসেনকে ঘিরে বিয়ের কাবিননামা, তালাকের কাগজপত্র ও নিবন্ধন-প্রক্রিয়া নিয়ে একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর কর্মস্থলে সাইনবোর্ড ও নিবন্ধন-সংক্রান্ত রেজিস্টার দৃশ্যমান নয়। পাশাপাশি নকল কাবিননামা তৈরি, বাল্যবিবাহ সম্পাদন এবং তালাকনামা প্রস্তুত ও নিবন্ধন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট নথি, লাইসেন্স এবং সরকারি রেজিস্টার পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

এদিকে প্রবাসী কামরুল হাসানের সঙ্গে শিমু আক্তারের বিয়ে ও পরবর্তী তালাক-সংক্রান্ত বিরোধে নাসির কাজির নাম সামনে এসেছে বলে দাবি করেছে শিমুর পরিবার। পরিবারের অভিযোগ, কামাল হাসানের কাছ থেকে ১৫ হাজার টাকা নিয়ে গোপনে তালাক-সংক্রান্ত কাগজ তৈরি করা হয়েছে। অন্যদিকে কাবিননামার কপি সংগ্রহের জন্য শিমুর বাবার কাছে ৬ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের পক্ষে ফোনালাপের রেকর্ডিং ও অন্যান্য নথি রয়েছে বলে পরিবার দাবি করেছে; তবে সেগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।

প্রবাসী স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতন ও প্রতারণার অভিযোগ

শিমু আক্তারের পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, মুন্সীগঞ্জের বাসিন্দা প্রবাসী কামরুল হাসান (৪০) বিয়ের পর প্রায় ১৪ মাস সংসার করেন। এরপর প্রায় দেড় মাস আগে স্ত্রীকে রেখে বিদেশে চলে যান। পরিবারের দাবি, বিয়ের আগে শিমুকে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। পরে দাম্পত্য বিরোধের মধ্যে শিমু শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

পরিবার আরও অভিযোগ করেছে, কামাল হাসানের বোনজামাই রমিজ উদ্দীন রুমিও নির্যাতনের ঘটনায় সম্পৃক্ত ছিলেন। এ বিষয়ে চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি থাকার দাবি করেছে পরিবার। নথিগুলো পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া ছাড়া অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

দেনমোহর ও কাবিননামার অঙ্ক নিয়ে বিরোধ

পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের সময় পাঁচ লাখ টাকা দেনমোহরের কথা বলা হলেও কাবিননামায় আড়াই লাখ টাকা লেখা হয়েছে। বাকি অর্থের পরিবর্তে গয়না দেওয়া হয়েছিল বলেও তারা দাবি করেছে। এ বিষয়ে কাবিননামার মূল কপি, বিয়ের সময় উপস্থিত সাক্ষী এবং উভয় পক্ষের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি।

পরিবারের দাবি, বিয়েটি পড়িয়েছিলেন নাসির কাজি, যাঁর নন্দীপাড়ায় একটি দোকান রয়েছে। ওই দোকানে কাজী হিসেবে তাঁর বৈধ নিয়োগ বা লাইসেন্সের তথ্য কী, কোন এলাকার জন্য তিনি অনুমোদিত এবং সংশ্লিষ্ট বিয়ে ও তালাকের এন্ট্রি সরকারি রেজিস্টারে রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের নথি থেকেই নিশ্চিত করা সম্ভব।

১৫ হাজার টাকা ও ৬ হাজার টাকা নিয়ে অভিযোগ

শিমু আক্তারের পরিবারের অভিযোগ, কামাল হাসানের কাছ থেকে ১৫ হাজার টাকা নিয়ে স্ত্রীকে না জানিয়ে তালাক-সংক্রান্ত কাগজ তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে কাবিননামার কপি পেতে শিমুর বাবার কাছে ৬ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪-এর ৯ ধারা অনুযায়ী, বিয়ে বা তালাক নিবন্ধন সম্পন্ন হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে রেজিস্টারের এন্ট্রির সত্যায়িত কপি বিনা চার্জে দেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে পরিবারের কাছে চাওয়া ছয় হাজার টাকা ঠিক কোন ধরনের কপির জন্য এবং কী কারণে চাওয়া হয়েছিল, তা নথি ও রসিদ যাচাই করে নিশ্চিত করা দরকার। ।

তালাকের ক্ষেত্রেও শুধু একটি কাগজ তৈরি হলেই তালাক আইনগতভাবে কার্যকর হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। তালাকের ধরন, প্রয়োজনীয় নোটিশ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নোটিশ পৌঁছানোর প্রমাণ এবং প্রযোজ্য আইনগত সময়সীমা যাচাই করা প্রয়োজন। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৭ ধারায় তালাকের নোটিশ ও কার্যকারিতা সম্পর্কে বিধান রয়েছে।

নকল কাবিননামা ও বাল্যবিবাহের অভিযোগ কতটা সত্য?

কাজী নাসির হোসেনের বিরুদ্ধে নকল কাবিননামা তৈরি, বাল্যবিবাহ সম্পাদন এবং তালাকনামা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগগুলো গুরুতর। তবে কোনো কাবিননামা নকল কি না, কোনো বিয়ে বাল্যবিবাহের আওতায় পড়ে কি না কিংবা তালাকের নথি আইনসম্মতভাবে তৈরি ও নিবন্ধিত হয়েছে কি না—এসব নির্ধারণের জন্য মূল নথি, সংশ্লিষ্ট রেজিস্টার, বিয়ের পক্ষগুলোর বয়সের প্রমাণ এবং নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন।

বাংলাদেশের মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪-এর ৪ ধারায় সরকার কর্তৃক নিকাহ রেজিস্ট্রারকে লাইসেন্স দেওয়ার বিধান রয়েছে। একই আইনের ৮ ধারায় বিয়ে ও তালাকের পৃথক রেজিস্টার সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। ১১ ধারায় অসদাচরণের অভিযোগে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল করার বিধান রয়েছে। ।

অন্যদিকে, বাল্যবিবাহের অভিযোগ যাচাই করতে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ এবং সংশ্লিষ্ট বিধান অনুসারে বিয়ের সময় বর-কনের বয়স ও প্রযোজ্য ব্যতিক্রমের বিষয়গুলো পরীক্ষা করা দরকার। ।

নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা চায় পরিবার

শিমু আক্তারের পরিবারের দাবি, তাঁদের অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করা হোক। কাজী নাসির হোসেনের লাইসেন্স, কর্মস্থলের পরিচিতি, বিয়ে ও তালাকের রেজিস্টার, সংশ্লিষ্ট কাবিননামা এবং অভিযোগে উল্লিখিত অর্থ লেনদেনের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বানও জানানো হয়েছে।

এদিকে কামরুল হাসান, রমিজ উদ্দীন রুমি ও নাসির কাজি—তিনজনের বক্তব্যই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের নথি যাচাই করে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে। অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়।

দৈনিক সময়ের কণ্ঠের অনুসন্ধানী অবস্থান: বিয়ে, তালাক ও পারিবারিক অধিকারসংক্রান্ত নথিতে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া উচিত। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনগত জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে; আর অভিযোগের সত্যতা না মিললে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য ও অবস্থানও যথাযথভাবে প্রকাশ করতে হবে।

অনুসন্ধান চলছে।

দৈনিক সময়ের কণ্ঠ — আমাদের কাগজ মানুষের কথা বলে।

জাতীয় নিউজ

Please Share This Post in Your Social Media