ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কাউছার-নাজিরকে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ, প্রশ্নের মুখে ডিসি আবু সাঈদের জবাব! অভিযোগ তদন্তের দায় এড়ানোর ইঙ্গিত? ৫৬ কর্মচারী বদলি হলেও অভিযুক্তদের বদলি কবে—সাংবাদিকের প্রশ্নে অস্পষ্ট উত্তর
- আপডেট টাইম : ১২:১০:০৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
- / ৫৮ ০০০.০০.বার দেখেছেন

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা কাউছার আহমেদ ও জেলা নাজির আরিফুর রহমানকে ঘিরে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ নিয়ে এবার সরাসরি প্রশ্নের মুখে পড়েছেন জেলা প্রশাসক মোঃ আবু সাঈদ।
দৈনিক সময়ের কণ্ঠের সম্পাদক মোহাম্মদ বোরহান হাওলাদার জসিম মুঠোফোনে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলে জানতে চান, তাঁর কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা কাউছার আহমেদ ও জেলা নাজির আরিফুর রহমানকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে যেসব অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে তিনি কোনো তদন্ত করেছেন কি না।
জবাবে জেলা প্রশাসক বলেন, তাঁরা অনিয়ম-দুর্নীতি করে থাকলে সেটা তাঁদের ব্যাপার। তিনি যাঁদের বদলি করেছেন, পর্যায়ক্রমে অন্যদেরও বদলি করা হবে।
জেলা প্রশাসকের এমন বক্তব্যের পরই নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—একটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কর্মরত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে সেটি কি শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিজস্ব বিষয়, নাকি দাপ্তরিক প্রধান হিসেবে জেলা প্রশাসকেরও তা খতিয়ে দেখার দায়িত্ব রয়েছে?
৫৬ জনের বদলি, অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম কেন?
গত ২ নভেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের নেজারত শাখা থেকে এক আদেশে ৫৬ জন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীকে বদলি করা হয়। বদলির তালিকায় ছিলেন ৬ জন দপ্তরি, ২৬ জন অফিস সহায়ক ও ২৪ জন প্রসেস সার্ভার।
কিন্তু দীর্ঘদিন একই কার্যালয়ে কর্মরত থাকা এবং বিভিন্ন অভিযোগে আলোচিত প্রশাসনিক কর্মকর্তা কাউছার আহমেদ ও জেলা নাজির আরিফুর রহমানের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।
সাংবাদিকের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসককে প্রশ্ন করা হয়, একজন সরকারি কর্মচারী কি দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে বহাল থাকতে পারেন? জবাবে তিনি জানান, পর্যায়ক্রমে সবাইকে বদলি করা হবে।
কিন্তু এখানেই প্রশ্ন—যাঁদের ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে, তাঁদের বদলির বিষয়টি কেন এখনো অনিশ্চিত? তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের অগ্রগতি কী? পর্যায়ক্রমে বদলির নির্দিষ্ট সময়সীমা কী?
সাংবাদিকের প্রশ্নে অস্পষ্টতা, শেষে কথোপকথনের ইতি
দৈনিক সময়ের কণ্ঠের সম্পাদক আরও জানতে চান, যাঁদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে কেন একই ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা দৃশ্যমান হচ্ছে না?
এ সময় জেলা প্রশাসক কথোপকথনের একপর্যায়ে বলেন, ‘আপনাদের মনে যা চায় তাই করুন।’
জেলা প্রশাসকের এমন বক্তব্যে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন দৈনিক সময়ের কণ্ঠের সম্পাদক। তাঁর প্রশ্ন, গণমাধ্যমের কাজই হচ্ছে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট অভিযোগ তুলে ধরা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানানো। তাহলে সাংবাদিক যখন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করবেন, তখন তাঁকে স্পষ্ট তথ্য ও ব্যাখ্যা না দিয়ে এমন উত্তর দেওয়া কতটা যুক্তিসংগত?
ডিসির কি তদন্তের দায়িত্ব নেই?
একজন জেলা প্রশাসক জেলার গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কর্মকর্তা। তাঁর অধীনস্থ কার্যালয়ে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়ম, দুর্নীতি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করার প্রশাসনিক দায়িত্ব রয়েছে।
অভিযোগ সত্য প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অপরাধী বলা যায় না। কিন্তু অভিযোগকে শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিষয় বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই।
কাউছার আহমেদ ও আরিফুর রহমানের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলোর সত্যতা যাচাই করা হয়েছে কি না, কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে কি না এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়কে জানানো হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
আইন মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এই পরিস্থিতি নিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, আইন মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে দৈনিক সময়ের কণ্ঠ।
আমাদের দাবি—
১। প্রশাসনিক কর্মকর্তা কাউছার আহমেদ ও জেলা নাজির আরিফুর রহমানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে।
২। তাঁদের বিরুদ্ধে আগে দাখিল করা অভিযোগগুলোর তদন্তের অগ্রগতি প্রকাশ করতে হবে।
৩। ৫৬ জন কর্মচারীর বদলির আদেশের প্রশাসনিক যৌক্তিকতা পর্যালোচনা করতে হবে।
৪। দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকা কর্মকর্তাদের বিষয়ে প্রচলিত বদলি নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হবে।
৫। জেলা প্রশাসকের বক্তব্য অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে বদলি করা হলে সেই প্রক্রিয়ার সময়সীমা ও মানদণ্ড স্পষ্ট করতে হবে।
৬। সরকারি দায়িত্ব পালনে কোনো কর্মকর্তা আর্থিক অনিয়ম বা ক্ষমতার অপব্যবহারে জড়িত থাকলে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
সম্পাদকের বক্তব্য: সাংবাদিক প্রশ্ন করবে, প্রশাসন জবাব দেবে
দৈনিক সময়ের কণ্ঠের সম্পাদক মোহাম্মদ বোরহান হাওলাদার জসিম বলেন, ‘আমরা কারও ব্যক্তিগত শত্রু নই। আমরা সংবাদমাধ্যম হিসেবে জনস্বার্থে প্রশ্ন করছি। একটি সরকারি কার্যালয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত করা হবে কি না, সেটি জানতে চাওয়া আমাদের দায়িত্ব। আমরা কি শুধু সংবাদ প্রকাশ করব, নাকি অভিযোগের নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহিও চাইব না?’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চাই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা নেওয়া হোক, আর মিথ্যা হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তথ্য-প্রমাণ দিয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করুন। কিন্তু প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সাংবাদিকদের নিরুৎসাহিত করা হলে জনগণের মনে আরও প্রশ্ন তৈরি হবে।’
শেষ প্রশ্ন: ৫৬ জন কর্মচারীকে বদলি করার প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যদি নেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা কর্মকর্তাদের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে বাধা কোথায়?
দৈনিক সময়ের কণ্ঠের অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও নতুন তথ্য পাওয়া গেলে পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।
অনুসন্ধান চলমান।






