Dhaka ০৬:২২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিজয়নগর উপজেলার চম্পকনগর থেকে জেলা শহরে যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম শিমরাইলকান্দি সড়ক

মহিন আলম সংবাদদাতা
  • আপডেট টাইম : ১০:২৭:২৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬
  • / ৩৩ ০০০ বার

১৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কে সিএনজি চালক ও মালিকদের গড়ে তোলা সিন্ডিকেটের কাছে সাধারণ যাত্রীরা রীতিমতো জিম্মি হয়ে পড়েছেন। প্রশাসনের নির্ধারণ করা ভাড়ার তোয়াক্কা না করে দিনদুপুরে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং সন্ধ্যা নামলেই তা দ্বিগুণ করার নৈরাজ্য এখন এই রুটের নিত্যদিনের ঘটনা।

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী নাগরিকদের বয়ানে উঠে এসেছে চরম ভোগান্তির চিত্র। সম্প্রতি এক ভুক্তভোগী নাগরিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন: গতকাল রাত আনুমানিক ৮:৪৫ থেকে ৯:০০টার মধ্যে শিমরাইলকান্দি থেকে চম্পকনগর যাওয়ার উদ্দেশ্যে সিএনজি স্ট্যান্ডে যাই। সেখানে ৬-৭টিরও বেশি গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল এবং কিছু যাত্রীও বসা ছিলেন। আমি চম্পকনগর যাওয়ার কথা বললে চালকরা ১০০ টাকা ভাড়া দাবি করেন। আমি জানতে চাই, রাত ৯টাও বাজেনি, তাহলে ৬০ টাকার ভাড়া কীভাবে হঠাৎ ১০০ টাকা হয়ে যায়? জবাবে বলা হলো, যেতে হলে আসেন, না হলে না।

মাত্র ২০ মিনিটের পথের জন্য সন্ধ্যা হলেই কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া ১০০ টাকা দাবি করা এবং চালকদের এমন বেপরোয়া আচরণ সাধারণ যাত্রীদের চরম অসহায়ত্বের ইঙ্গিত দেয়।

গত ১০ মার্চ উপজেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে রাজনৈতিক প্রতিনিধি, সিএনজি মালিক-শ্রমিক এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সবার মতামতের ভিত্তিতে টুকচানপুর থেকে শিমরাইলকান্দি ব্রিজ পর্যন্ত জনপ্রতি ভাড়া ৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয় এবং কথা ছিল ঈদের পর থেকে এটি কার্যকর হবে। কিন্তু প্রশাসনের সিদ্ধান্তের মাত্র দুদিন পর, ১২ মার্চ সিএনজি মালিক ও শ্রমিকরা নিজেদের মধ্যে বৈঠক করে প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ৬০ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করেন। বাস্তবে ঈদের অজুহাত ও পরবর্তীতে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির কথা বলে এই ভাড়া বৃদ্ধি বহাল রাখা হয় এবং গ্যাসের দাম কমলেও ভাড়া আর কমানো হয়নি।

ভাড়া নিয়ে এই নৈরাজ্য নিরসনে অতীতে বহুবার প্রশাসনিক আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে। সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), সংসদ সদস্য এবং তৎকালীন জেলা প্রশাসকের সমন্বয়ে ভাড়া ২০ টাকা কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এমনকি বিজয়নগর থানার সবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে ফজলুল হকও টুকচাঁনপুর সিএনজি স্টেশনে বৈঠক করে ভাড়া কমানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে সিন্ডিকেটের দাপটে এই সিদ্ধান্তগুলোর কোনোটিই আলোর মুখ দেখেনি।

নাগরিকরা আক্ষেপ করে বলছেন, পার্শ্ববর্তী নাসিরনগর বা সরাইল উপজেলায় প্রশাসনের নির্ধারিত ভাড়া কঠোরভাবে বাস্তবায়িত হতে দেখা গেলেও বিজয়নগরে যেন চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে নিয়ম বা সিদ্ধান্ত থাকলেও তার কোনো কার্যকারিতা নেই।

অন্যদিকে সিন্ডিকেটের এই দৌরাত্ম্যের বিরুদ্ধে সত্য তুলে ধরলে নেমে আসছে চরম পরিণতি। সিএনজি ভাড়ার নৈরাজ্য এবং পরিবহন সিন্ডিকেটের এই বেপরোয়া আচরণের বিরুদ্ধে জনস্বার্থে সংবাদ প্রকাশ করায় এক সাংবাদিককে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার গুরুতর অভিযোগও উঠে এসেছে।

সিএনজি চালকদের দাবি গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি, যন্ত্রাংশের চড়া দাম এবং সড়কের বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজির কারণে তাদের দৈনন্দিন পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে। তাই কম ভাড়ায় গাড়ি চালালে তাদের লোকসান হয়।

তবে যাত্রীদের অভিযোগ, চালকদের এই যুক্তি সিন্ডিকেটের একটি অজুহাত মাত্র। স্ট্যান্ডে পর্যাপ্ত গাড়ি থাকলেও যাত্রীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়। কেউ প্রতিবাদ করলে চালকরা সংঘবদ্ধ হয়ে গাড়ি চালানো বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয়।

পরিশেষে দ্রুত একটি নির্দিষ্ট ভাড়ার তালিকা প্রণয়ন এবং তা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমেই কেবল এই জিম্মিদশা থেকে মুক্তি মিলতে পারে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

জাতীয় নিউজ

বিজয়নগর উপজেলার চম্পকনগর থেকে জেলা শহরে যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম শিমরাইলকান্দি সড়ক

আপডেট টাইম : ১০:২৭:২৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

১৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কে সিএনজি চালক ও মালিকদের গড়ে তোলা সিন্ডিকেটের কাছে সাধারণ যাত্রীরা রীতিমতো জিম্মি হয়ে পড়েছেন। প্রশাসনের নির্ধারণ করা ভাড়ার তোয়াক্কা না করে দিনদুপুরে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং সন্ধ্যা নামলেই তা দ্বিগুণ করার নৈরাজ্য এখন এই রুটের নিত্যদিনের ঘটনা।

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী নাগরিকদের বয়ানে উঠে এসেছে চরম ভোগান্তির চিত্র। সম্প্রতি এক ভুক্তভোগী নাগরিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন: গতকাল রাত আনুমানিক ৮:৪৫ থেকে ৯:০০টার মধ্যে শিমরাইলকান্দি থেকে চম্পকনগর যাওয়ার উদ্দেশ্যে সিএনজি স্ট্যান্ডে যাই। সেখানে ৬-৭টিরও বেশি গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল এবং কিছু যাত্রীও বসা ছিলেন। আমি চম্পকনগর যাওয়ার কথা বললে চালকরা ১০০ টাকা ভাড়া দাবি করেন। আমি জানতে চাই, রাত ৯টাও বাজেনি, তাহলে ৬০ টাকার ভাড়া কীভাবে হঠাৎ ১০০ টাকা হয়ে যায়? জবাবে বলা হলো, যেতে হলে আসেন, না হলে না।

মাত্র ২০ মিনিটের পথের জন্য সন্ধ্যা হলেই কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া ১০০ টাকা দাবি করা এবং চালকদের এমন বেপরোয়া আচরণ সাধারণ যাত্রীদের চরম অসহায়ত্বের ইঙ্গিত দেয়।

গত ১০ মার্চ উপজেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে রাজনৈতিক প্রতিনিধি, সিএনজি মালিক-শ্রমিক এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সবার মতামতের ভিত্তিতে টুকচানপুর থেকে শিমরাইলকান্দি ব্রিজ পর্যন্ত জনপ্রতি ভাড়া ৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয় এবং কথা ছিল ঈদের পর থেকে এটি কার্যকর হবে। কিন্তু প্রশাসনের সিদ্ধান্তের মাত্র দুদিন পর, ১২ মার্চ সিএনজি মালিক ও শ্রমিকরা নিজেদের মধ্যে বৈঠক করে প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ৬০ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করেন। বাস্তবে ঈদের অজুহাত ও পরবর্তীতে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির কথা বলে এই ভাড়া বৃদ্ধি বহাল রাখা হয় এবং গ্যাসের দাম কমলেও ভাড়া আর কমানো হয়নি।

ভাড়া নিয়ে এই নৈরাজ্য নিরসনে অতীতে বহুবার প্রশাসনিক আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে। সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), সংসদ সদস্য এবং তৎকালীন জেলা প্রশাসকের সমন্বয়ে ভাড়া ২০ টাকা কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এমনকি বিজয়নগর থানার সবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে ফজলুল হকও টুকচাঁনপুর সিএনজি স্টেশনে বৈঠক করে ভাড়া কমানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে সিন্ডিকেটের দাপটে এই সিদ্ধান্তগুলোর কোনোটিই আলোর মুখ দেখেনি।

নাগরিকরা আক্ষেপ করে বলছেন, পার্শ্ববর্তী নাসিরনগর বা সরাইল উপজেলায় প্রশাসনের নির্ধারিত ভাড়া কঠোরভাবে বাস্তবায়িত হতে দেখা গেলেও বিজয়নগরে যেন চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে নিয়ম বা সিদ্ধান্ত থাকলেও তার কোনো কার্যকারিতা নেই।

অন্যদিকে সিন্ডিকেটের এই দৌরাত্ম্যের বিরুদ্ধে সত্য তুলে ধরলে নেমে আসছে চরম পরিণতি। সিএনজি ভাড়ার নৈরাজ্য এবং পরিবহন সিন্ডিকেটের এই বেপরোয়া আচরণের বিরুদ্ধে জনস্বার্থে সংবাদ প্রকাশ করায় এক সাংবাদিককে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার গুরুতর অভিযোগও উঠে এসেছে।

সিএনজি চালকদের দাবি গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি, যন্ত্রাংশের চড়া দাম এবং সড়কের বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজির কারণে তাদের দৈনন্দিন পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে। তাই কম ভাড়ায় গাড়ি চালালে তাদের লোকসান হয়।

তবে যাত্রীদের অভিযোগ, চালকদের এই যুক্তি সিন্ডিকেটের একটি অজুহাত মাত্র। স্ট্যান্ডে পর্যাপ্ত গাড়ি থাকলেও যাত্রীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়। কেউ প্রতিবাদ করলে চালকরা সংঘবদ্ধ হয়ে গাড়ি চালানো বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয়।

পরিশেষে দ্রুত একটি নির্দিষ্ট ভাড়ার তালিকা প্রণয়ন এবং তা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমেই কেবল এই জিম্মিদশা থেকে মুক্তি মিলতে পারে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।