Dhaka ০২:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কেপ ভার্দে : রূপকথায় শুরু মহাকাব্যে সমাপ্তি

খেলার খাবার
  • আপডেট টাইম : ১২:২৪:১৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬
  • / ১২০ ০০০.০০.বার দেখেছেন

বিশ্ব ফুটবল যখন বিশাল বাজেট, আধুনিক অবকাঠামো আর কোটি কোটি টাকার স্পন্সরশিপের নিখুঁত সমীকরণে বন্দি, ঠিক তখন আটলান্টিক মহাসাগরের বুক চিরে ভেসে উঠল এক অবিশ্বাস্য আওয়াজ। মাত্র ৫ লাখ জনসংখ্যার ক্ষুদ্র এক দ্বীপরাষ্ট্র, যার নাম কেপ ভার্দে। অথচ এই পুঁচকে দলটিই বিশ্বমঞ্চে বিশ্বসেরাদের চোখ রাঙিয়ে রচনা করল এক নতুন মহাকাব্য।
ফুটবল দুনিয়ায় তারা পরিচিত ‘ব্লু শার্কস’ বা নীল হাঙর নামে। সমুদ্রবেষ্টিত এই দ্বীপের মানুষগুলোর বেঁচে থাকার লড়াইটা চিরকালই কঠিন। একসময় যে দেশের শিশুরা কেবল টেলিভিশনের পর্দায় ঝকঝকে স্টেডিয়ামে ফুটবল তারকাদের জাদুকরী ড্রিবলিং দেখত, আজ তারা নিজেরাই সেই মঞ্চের অন্যতম মূল চরিত্রে পরিণত হয়েছে। এসওয়াতিনিকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে যেদিন কেপ ভার্দে তাদের প্রথম বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা অর্জন করে, সেদিন দ্বীপটির প্রতিটি প্রান্তে আনন্দের যে সুনামি বয়ে গিয়েছিল, সেই রূপকথা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। সমুদ্রের নোনা বাতাস ছাপিয়ে সেদিন পুরো দেশে প্রতিধ্বনিত হয়েছিল কান্নার সুরে মেশা আনন্দের গর্জন। পরিচিত কিংবা অচেনা, প্রতিটি মানুষ মেতে উঠেছিল উৎসবের অভিন্ন এক মিছিলে।
এই দ্বীপরাষ্ট্রে ফুটবলের ইতিহাস কোনো বিলাসবহুল একাডেমির শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে শুরু হয়নি। এর শুরু সান্তা ক্রুজের ধুলোবালি মাখা মেঠোপথে, যেখানে নোনা জল আর তপ্ত বালুর ওপর খালি পায়ে কিশোররা ফুটবলকে ভালোবেসেছিল। স্কুল ছুটির পর ছেঁড়া কাপড়ের বল বা প্লাস্টিকের গোলকটা নিয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ছুটে চলাই ছিল তাদের বড় আনন্দ। আজ সেই ধুলোমাখা স্বপ্নই রূপ নিয়েছে এক জাতীয় উন্মাদনায়। স্থানীয় সান্তা ক্রুজ মাঠের এক কোণে দাঁড়িয়ে যখন ১৪ বছরের কিশোর ইউরি মার্লে ফার্নান্দেস বল পায়ে ড্রিবলিংয়ের ঝড় তোলে, তখন তার চোখে আর কোনো জড়তা দেখা যায় না। সে বুক ফুলিয়ে বলে, ‘আমি খুব দ্রুত দৌড়াতে পারি, গোল করতে পারি এবং আমি একদিন বিশ্বের সেরা হব।’ এই শিশুসুলভ সরলতাই আজ পুরো কেপ ভার্দের আত্মবিশ্বাসের মূল জ্বালানি।
বিশ্বকাপের মঞ্চে যখন কেপ ভার্দের নাম প্রথম উচ্চারিত হয়, অধিকাংশ বড় দলই তাদের স্রেফ পয়েন্ট টেবিল ভারী করার দল হিসেবে গণ্য করেছিল। কিন্তু গ্রুপ ‘এইচ’-এর লড়াই শুরু হতেই পাল্টে যায় সব হিসাব-নিকাশ। আটলান্টার সবুজ গালিচায় নিজেদের প্রথম ম্যাচেই তারা মুখোমুখি হয় ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি স্পেনের, যেখানে বিশ্ব কাঁপানো তরুণ ফুটবলার লামিনে ইয়ামাল ছিলেন স্প্যানিশ আক্রমণের মূল কাণ্ডারি। কিন্তু কেপ ভার্দের ইস্পাতকঠিন রক্ষণব্যূহের সামনে স্পেনের সব আক্রমণ ঢেউয়ের মতো এসে ভেঙে পড়ে। ম্যাচটি গোলশূন্য (০-০) ড্র করে প্রথম ম্যাচেই বিশ্বকে চমকে দিয়ে ফের রূপকথার গল্প লিখে ফেলে ব্লু শার্করা।
তাদের এই প্রতিরোধ যেকোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, তার প্রমাণ মেলে পরের ম্যাচেই। সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ের বিপক্ষে বুক চিতিয়ে লড়াই করে তারা ২-২ গোলের নাটকীয় ড্র ছিনিয়ে আনে। এরপর গ্রুপের শেষ ম্যাচে এশিয়ার অন্যতম পরাশক্তি সৌদি আরবও কেপ ভার্দের রক্ষণদুর্গ ভেদ করতে ব্যর্থ হয় এবং ম্যাচটি ০-০ গোলে অমীমাংসিত থেকে যায়। গোলপোস্টের নিচে তখন অতিমানবীয় প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন গোলরক্ষক ভোজিনহা। তার একের পর এক চোখধাঁধানো সেভের ওপর ভর করে মাত্র ২ গোল হজম করে অপরাজিত রানার্সআপ হিসেবে শেষ বত্রিশের গৌরবময় টিকিট নিশ্চিত করে কেপ ভার্দে।
নকআউটের প্রথম পর্বেই কেপ ভার্দের সামনে আসে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা, বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। লিওনেল মেসির আলবিসেলেস্তেদের বিরুদ্ধে খেলা যেকোনো দলের জন্যই এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক চাপ। কিন্তু কেপ ভার্দে মাঠে নেমেছিল ভয়হীন ফুটবল খেলার মন্ত্র নিয়ে। ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনাকে স্তব্ধ করে দিয়ে কাউন্টার অ্যাটাক থেকে দৃঢ় মনোবলের জোরে দুটি অসাধারণ গোল আদায় করে নেয় দ্বীপরাষ্ট্রটি। পুরো ম্যাচজুড়ে ভোজিনহার অতিমানবীয় গোলকিপিং বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ঘাম ছুটিয়ে দিয়েছিল। তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচটিতে শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিলেও, মাঠে কেপ ভার্দে শুধু ম্যাচটিই হেরেছে, কিন্তু জয় করেছে কোটি ফুটবল ভক্তের মন।
কেপ ভার্দের এই অবিশ্বাস্য রূপকথা কেবল মাঠের কিছু স্কোরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দৃঢ় আত্মবিশ্বাসই যে তাদের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। দলটির নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার স্টোপিরার কণ্ঠে মিলে তার আঁচ, ‘এটা শুধু আমার স্বপ্ন নয়, এটা পুরো দেশের স্বপ্ন।’বর্তমানে বিশ্ব ফুটবলের অভিভাবক সংস্থা ফিফার বিশেষ অর্থায়নে এই দ্বীপরাষ্ট্রে তৈরি হচ্ছে অত্যাধুনিক ফুটবল একাডেমি, আধুনিকায়ন করা হচ্ছে স্থানীয় মাঠগুলোর। ফুটবল এখন কেপ ভার্দের তরুণদের কাছে কেবল একটি জনপ্রিয় খেলা নয়, এটি অন্ধকার থেকে আলোতে আসার এক নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক জানালা। আটলান্টিকের এই ছোট্ট দ্বীপের ফুটবল মহাকাব্যে হয়তো একটি টুর্নামেন্টের সমাপ্তি ঘটেছে, কিন্তু তাদের স্বপ্নের যে অনন্ত যাত্রা শুরু হলো, তার কোনো শেষ নেই। সামনে হয়তো লিখবে তারা নতুন কোনো রূপকথার গল্প!

জাতীয় নিউজ

Please Share This Post in Your Social Media