জনবলের অভাবে স্মৃতিচিহ্ন নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে
- আপডেট টাইম : ১২:৫১:৫৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬
- / ২৩ ০০০ বার

কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা বা নিরাপত্তা প্রটোকল ছাড়াই হুট করে চালু করা হয়েছে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে শহীদদের অমূল্য স্মৃতিচিহ্ন ও স্পর্শকাতর স্থাপনাসমূহ। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সেকশন ও স্মারক সরিয়ে ফেলার গুরুতর অভিযোগ ইতিহাস বিকৃতির শঙ্কাকে আরো তীব্র করে তুলেছে। কোনো ধরনের জনবল বা স্টাফ নিয়োগ না দিয়ে এবং সিকিউরিটি প্রটোকলের মহড়া না করেই জাদুঘর খুলে দেওয়ার ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।
গতকাল শনিবার আমার দেশকে তিনি বলেন, ‘কোনো রকম স্টাফ না দিয়ে, সিকিউরিটি প্রটোকল রিহার্সাল না করে এভাবে মিউজিয়ামটা কোন বিবেচনায় খোলা হলো, এটা আমার কাছে বিস্ময়কর লাগছে।’
ফারুকী বলেন, এ জাদুঘরে শহীদদের স্মৃতিচিহ্ন আছে, অনেক ইলেকট্রনিক ইকুইপমেন্ট আছে। এভাবে নিরাপত্তাব্যবস্থা না মেনে কেউ জাদুঘরে ঢুকলে বহু জিনিস নষ্ট হয়ে যাবে। এমন অনেক জিনিস আছে, যেটা একবার নষ্ট হলে আর পাওয়া যাবে না। তিনি বলেন, ‘এ জাদুঘর কেপিআই ওয়ানভুক্ত ইনস্টলেশন। এরকম স্পর্শকাতর ইনস্টলেশন এরকম এতিম দশায় ওপেন করা হলো কেন? সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর সত্যিকারের উদ্যোগী হলে এতদিনে সঠিকভাবে উদ্বোধন করা যেত। দরকার হলে সাময়িক বন্ধ রাখেন। তারপর যথাযথ স্টাফিং, সিকিউরিটি প্রটোকল রিহার্সাল করে চালু করেন’—মন্তব্য করেন তিনি।
জুলাই স্মৃতি জাদুঘর প্রস্তুতির কাজে যুক্ত ছিলেন এমন একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমার দেশকে বলেন, বর্তমানে কোনো পেশাদার ব্যবস্থাপনা কমিটি নেই। ফলে গবেষকদেরও শ্রমিক ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর মতো কাজ করতে হচ্ছে। কাচের ভেতরে রাখা শহীদদের স্মৃতি স্মারকগুলো ভেঙে যাচ্ছে। মানুষ হাত দিয়ে সেগুলো ধরছে, কিন্তু তা বাধা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত লোকবল নেই।
তিনি বলেন, বিভিন্ন ইনস্টলেশন, বিশেষ করে আন্দোলনের আইকনিক ছবিগুলো উন্মুক্ত থাকায় মানুষের হাত লাগার কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ও খুলে পড়ে যাচ্ছে। শহীদ ইব্রাহিমের সাইকেলের মতো বড় বড় স্মারকগুলো একদমই অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। এগুলোর সামনে কেবল একটি লোহার শেকল দিয়ে রাখা হয়েছে; যে কেউ সেই বড় স্মারকগুলো হাত দিয়ে স্পর্শ করছে, কিন্তু বাধা দেওয়ার মতো কেউ নেই।
তিনি আরো বলেন, সীমান্ত হত্যা নিয়ে নির্ধারিত রুমটি এখনো পুরোপুরি ফাঁকা পড়ে আছে এবং সেখানে কোনো ইনস্টলেশন নেই, কেবল ক্যাম্পাস ভায়োলেন্সের দুটি ফটো লাইটবক্স রাখা হয়েছে। ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের ভিকটিমদের জন্য নির্দিষ্ট রুমটির বিশেষ কোনো ইনস্টলেশনই আর নেই। ডিজিটাল প্রেস নামের যে প্রজেক্টরে ভিকটিমদের ধরে নিয়ে যাওয়ার পেপার কাটিং দেখানো হতো, সেটিও নেই। প্রতিদিন অতিরিক্ত মানুষ আসছে এবং সবার উদ্দেশ্য জানা সম্ভব নয়।
নিরাপত্তা ঝুঁকির আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, পতিত স্বৈরাচার ও তার দোসররা যেকোনো সময় এ জাদুঘরের সহজে ক্ষতি করতে পারে। প্রবেশপথ থেকে শুরু করে একদম জাদুঘরের হল পর্যন্ত বিশেষ কোনো নজরদারি নেই এবং মাঝে মাঝে পথচারীরাও দেদার ঢুকে পড়ছে। উন্মুক্ত থাকা ও মানুষের স্পর্শ লাগার কারণে টিভি ও ট্যাবগুলো বিভিন্নভাবে নষ্ট হচ্ছে।
এছাড়া ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট (ডিএসএ)-এর মাধ্যমে নিপীড়নের শিকার ভিকটিমদের আলামত ও ইতিহাসের সেকশনটিকে ছোট করে ফেলা হয়েছে।
এদিকে জুলাই জাদুঘর পরিদর্শন শেষে গতকাল শনিবার জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘সদ্য উদ্বোধন হওয়া জুলাই ৩৬ গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর থেকে সীমান্ত হত্যা এবং মোদিবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি সরিয়ে ফেলা হয়েছে।’
তিনি অভিযোগ করেন, সীমান্ত হত্যার আলামত ও রেকর্ডসংবলিত ‘বর্ডার কিলিং রুম’ সেকশন পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা, সীমান্ত হত্যার শিকার ফেলানীর ভাস্কর্য অপসারণ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ‘লংমার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির অংশ বাদ দেওয়া এবং আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মোদিবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসসংবলিত সেকশনটি তুলে নেওয়া হয়েছে।
‘ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখার জন্য ইতিহাসের কোনো অংশ বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই’—মন্তব্য করেন নাহিদ।
জাদুঘর পরিচালনার জন্য দ্রুত জনবল নিয়োগের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে এখানে পর্যাপ্ত জনবল নেই। প্রায় ২০০ জনের মতো জনবল প্রয়োজন হলেও এখন পর্যন্ত ১৫-২০ জন কাজ করছেন এবং আপাতত স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এতে জাদুঘরটি নিরাপত্তাহীনতা ও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।



















