Dhaka ১০:৩০ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১২০ কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ: বিএলআরআইয়ের পিডি সাজেদুলকে ঘিরে স্বজনপ্রীতি ও অর্থ ব্যয়ের প্রশ্ন ফেলোশিপে স্ত্রীর সুবিধা, দরপত্র ছাড়া কাজ বণ্টন ও কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগ; নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট টাইম : ০৪:১২:৩৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
  • / ১০৭ ০০০.০০.বার দেখেছেন

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) পোল্ট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদারকরণ প্রকল্পে ১২০ কোটি টাকার বেশি সরকারি অর্থ ব্যয়কে কেন্দ্র করে নানা অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের অর্থ ব্যয়, গবেষণা কার্যক্রম, ফেলোশিপ প্রদান, কেনাকাটা এবং দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন প্রকল্প পরিচালক ও বিএলআরআইয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. সাজেদুল করিম সরকার।

প্রাপ্ত তথ্য ও প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৯ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া ‘পোল্ট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদারকরণ (১ম সংশোধিত)’ প্রকল্পে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত মোট ১২০ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্পের বড় একটি অংশ ভবন নির্মাণ, জমি অধিগ্রহণ ও ভারী সরঞ্জাম কেনাকাটায় ব্যয় হয়েছে। অথচ প্রকল্পের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য গবেষণা ও দক্ষ জনবল তৈরি হলেও সে খাতে ব্যয়ের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম।

গবেষণার চেয়ে অবকাঠামো ও কেনাকাটায় বেশি ব্যয়?

প্রতিবেদনে উল্লেখিত হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে ৮১ কোটি ২৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে ভবন নির্মাণ, জমি অধিগ্রহণ ও ভারী সরঞ্জাম কেনাকাটায়। অন্যদিকে গবেষণা ও ফেলোশিপ খাতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৭ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।

এ ছাড়া পোল্ট্রি খাদ্য ও ফিড অ্যাডিটিভস কেনায় ১২ কোটি ৪২ লাখ টাকা ব্যয়ের তথ্য উঠে এসেছে, যা সংশ্লিষ্ট বরাদ্দের তুলনায় বেশি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। প্রকল্পের উদ্দেশ্য ও অর্থ ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য ছিল কি না, তা নিয়ে নিরীক্ষার দাবি উঠেছে।

স্ত্রীর ফেলোশিপ নিয়ে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ

প্রকল্প পরিচালক ড. সাজেদুল করিম সরকারের স্ত্রী ড. ফারহানা শারমীনকে পোস্ট-ডক্টরাল ফেলোশিপ দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই তাঁকে ফেলোশিপের সুযোগ দেওয়া হয় এবং মাসিক ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ভাতা প্রদান করা হয়। প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, ফেলোশিপ খাতের বরাদ্দের বড় অংশ তিনি পেয়েছেন।

২০২২ সালের একটি সরকারি তদন্তে এ বিষয়ে অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে বলেও প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তদন্তের মূল প্রতিবেদন, সংশ্লিষ্ট আদেশ এবং ফেলোশিপ প্রদানের নীতিমালা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

দরপত্র ছাড়া কাজ বণ্টন ও কেনাকাটায় প্রশ্ন

প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত বাবদ প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকার কাজ দরপত্র ছাড়া বণ্টনের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে ভুয়া দোকানের নামে সরবরাহ ভাউচার তৈরি করে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও করা হয়েছে।

এ ছাড়া গবেষণাগারে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকা সত্ত্বেও প্রায় ২ কোটি ১৫ লাখ টাকায় চারটি ইনকিউবেটর কেনার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্পের মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহন ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কাজে ব্যবহারের অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে ক্রয়সংক্রান্ত নথি, দরপত্র, কার্যাদেশ, বিল-ভাউচার, ব্যবহার রেজিস্টার এবং প্রকল্পের সম্পদ যাচাই করা প্রয়োজন।

প্রকল্প পরিচালকের বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক ড. মো. সাজেদুল করিম সরকার সব ধরনের অনিয়ম অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, প্রচলিত বিধিবিধান অনুসরণ করে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেই প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে।

তবে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে আরও কিছু সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে তাঁর বিস্তারিত বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।

দুদক ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের তদন্ত দাবি

সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বিশেষ করে গবেষণা ও প্রাণিসম্পদ উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে কোনো ধরনের অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ থাকলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।

এ অবস্থায় প্রকল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব আর্থিক লেনদেন, ফেলোশিপ বিতরণ, কেনাকাটা, দরপত্র ও কার্যাদেশের নিরপেক্ষ নিরীক্ষা দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে।

দৈনিক সময়ের কণ্ঠের পর্যবেক্ষণ: অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা যায় না। তবে সরকারি অর্থের প্রতিটি টাকার হিসাব জনগণের কাছে স্বচ্ছ থাকা জরুরি। প্রকল্প পরিচালকের বক্তব্য, সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন এবং প্রকল্পের মূল নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র সামনে আনা প্রয়োজন।

অনুসন্ধান চলমান।

জাতীয় নিউজ

Please Share This Post in Your Social Media