সম্পাদকীয় সরকার কোনো ধর্মের দয়ায় নয়, জনগণের ভোটে—ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার করা বন্ধ হোক
- আপডেট টাইম : ০১:২১:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
- / ৯৪ ০০০.০০.বার দেখেছেন

বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এ দেশের মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান—সব ধর্মের মানুষের রয়েছে সমান নাগরিক মর্যাদা, সাংবিধানিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের কাছে ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার। অথচ রাজনৈতিক বক্তব্যে যখন কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়কে সরকার গঠনের কৃতিত্ব দেওয়া হয় কিংবা অন্য ধর্মের মানুষকে রাজনৈতিক সমীকরণের বিপরীতে দাঁড় করানো হয়, তখন তা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য উদ্বেগ তৈরি করে।
সম্প্রতি দুর্গাপূজাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর বক্তব্যে এমন দাবি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে—বাংলাদেশে বিএনপি সরকার গঠনের পেছনে মুসলমানদের চেয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভূমিকা বেশি। যদি এমন বক্তব্য দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক: একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার গঠনের কৃতিত্ব কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষের নামে প্রচার করার উদ্দেশ্য কী?
সরকার গঠনের বৈধ ভিত্তি জনগণের সমর্থন ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া—কোনো একটি ধর্মীয় সম্প্রদায় নয়। নির্বাচনে বিভিন্ন ধর্মের নাগরিক তাঁদের পছন্দ অনুযায়ী ভোট দিতে পারেন। তাঁদের রাজনৈতিক পছন্দকে সম্মান করা গণতন্ত্রের অংশ। কিন্তু সেই ভোটকে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ভাগ করে রাজনৈতিক কৃতিত্ব দাবি করা সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচয় হতে পারে না।
ধর্মীয় অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক বক্তব্য কতটা যুক্তিসংগত?
দুর্গাপূজা হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। এই উৎসবে রাজনৈতিক নেতাদের শুভেচ্ছা জানানো, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশ্বাস দেওয়া এবং সংখ্যালঘু নাগরিকদের অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া ইতিবাচক রাজনৈতিক আচরণ। কিন্তু ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মঞ্চে যদি কোনো সম্প্রদায়কে নিজেদের রাজনৈতিক বিজয়ের প্রধান কারিগর হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে সেই বক্তব্যের উদ্দেশ্য ও প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
কেউ যদি হিন্দু সম্প্রদায়ের অবদান স্বীকার করতে চান, তা অবশ্যই করতে পারেন। একইভাবে মুসলমানসহ সব ধর্মের নাগরিকের অবদানও সম্মানের সঙ্গে স্বীকার করতে হবে। কিন্তু একটি সম্প্রদায়কে অন্যটির বিপরীতে দাঁড় করিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া হলে তা সম্প্রীতি জোরদার করার পরিবর্তে বিভাজন বাড়াতে পারে।
ভোটের হিসাব নয়, নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা চাই
বাংলাদেশের হিন্দু নাগরিকদের নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সম্পত্তির অধিকার এবং সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা সরকারের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। এই অধিকার কোনো রাজনৈতিক দলের অনুগ্রহ নয়। একইভাবে মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান কিংবা ধর্মীয় পরিচয়হীন নাগরিকের অধিকারও সমানভাবে সুরক্ষিত থাকতে হবে।
কোনো রাজনৈতিক দল যদি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সমর্থন পেয়ে থাকে, তবে সেটি নির্বাচনী বাস্তবতার অংশ হতে পারে। কিন্তু সেই সমর্থনকে রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ার বানিয়ে অন্য সম্প্রদায়ের অবদান খাটো করা উচিত নয়। বরং রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত জনগণের কাছে ব্যাখ্যা করা—তারা কীভাবে আইনের শাসন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, দুর্নীতি দমন এবং নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
বিএনপির নেতৃত্বের কাছে প্রশ্ন
যেসব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে এমন রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উচিত বক্তব্যগুলো যাচাই করা এবং প্রয়োজন হলে স্পষ্ট অবস্থান জানানো। বক্তব্যের ভিডিও, স্থান, সময় ও বক্তার পরিচয় যাচাই না করে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যেমন অনুচিত, তেমনি ধর্মীয় বিভাজন সৃষ্টিকারী বক্তব্যের অভিযোগকেও উপেক্ষা করা যায় না।
রাজনীতি হোক মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ভোটের মালিকানা দাবি করার জন্য নয়। মুসলমানের ভোট, হিন্দুর ভোট কিংবা অন্য কোনো ধর্মের মানুষের ভোট—সবই একজন নাগরিকের স্বাধীন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রকাশ। কোনো দলই এককভাবে কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ভোটের মালিক নয়।
আমাদের প্রত্যাশা
আমরা চাই, রাজনৈতিক দলগুলো ধর্মীয় উৎসবকে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধির উপলক্ষ হিসেবে দেখুক। দুর্গাপূজার মঞ্চ হোক নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার প্রতিশ্রুতির মঞ্চ। মসজিদ, মন্দির, গির্জা কিংবা বৌদ্ধবিহার—কোনোটিই যেন বিভাজনমূলক রাজনৈতিক বক্তব্যের হাতিয়ার না হয়।
মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ কোনো একটি ধর্মের মানুষের একক সম্পত্তি নয়; এটি সব নাগরিকের দেশ। সরকার গঠিত হয় জনগণের সমর্থন ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায়। তাই কোনো রাজনৈতিক দলের বিজয়কে এক ধর্মের কৃতিত্ব এবং অন্য ধর্মের অবদানকে অস্বীকার করার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়।
দৈনিক সময়ের কণ্ঠ মনে করে, ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার—আর গণতন্ত্রের শক্তি বিভাজনে নয়, জনগণের ঐক্যে।













