Dhaka ০৩:০১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সম্পাদকীয় প্রেস ক্লাবের নামে চাঁদাবাজি-দালালি বন্ধ হোক, সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষা করা হোক

সম্পাদকীয় | দৈনিক সময়ের কণ্ঠ
  • আপডেট টাইম : ০২:৪৭:২০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
  • / ৫৭ ০০০.০০.বার দেখেছেন

ঢাকা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম থেকে গাজীপুর, জেলা-উপজেলা সর্বত্র প্রেস ক্লাবের নামে পরিচয়ের প্রতিযোগিতা ও কথিত অপকর্মের বিরুদ্ধে এবার সোচ্চার হওয়ার সময় এসেছে।

সাংবাদিকতা একটি মহান ও দায়িত্বশীল পেশা। রাষ্ট্র, সমাজ ও জনগণের কাছে সত্য তুলে ধরা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার প্রকাশ করাই সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব। অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আজ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিকতা ও প্রেস ক্লাবের নাম ব্যবহার করে এমন কিছু কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠছে, যা পুরো পেশার সম্মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

ঢাকা মহানগর থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা, এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠছে বিভিন্ন নামের প্রেস ক্লাব। কোথাও জাতীয় প্রেস ক্লাব, কোথাও জেলা প্রেস ক্লাব, কোথাও উপজেলা প্রেস ক্লাব, আবার কোথাও অদ্ভুত সব নামের সংগঠন। প্রশ্ন হচ্ছে, এসব প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষা, নাকি প্রেস ক্লাবের পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিগত প্রভাব, রাজনৈতিক তোষামোদ ও আর্থিক সুবিধা অর্জন?

অভিযোগ রয়েছে, কিছু ব্যক্তি প্রেস ক্লাবের পরিচয় ব্যবহার করে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তার, দালালি, চাঁদাবাজি, তদবির এবং বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন। কেউ কেউ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা দেখিয়ে নিজেদের বিশেষ ক্ষমতাধর হিসেবে উপস্থাপন করছেন। আবার কেউ সাংবাদিকতার পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।

এসব অভিযোগের প্রতিটি নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কারণ, অভিযোগ আর অপরাধ এক বিষয় নয়। কিন্তু অভিযোগের আড়ালে যদি সত্যিই কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে, তাহলে সাংবাদিক পরিচয় কোনোভাবেই দায়মুক্তির ঢাল হতে পারে না।

প্রেস ক্লাব কি চাঁদাবাজি ও দালালির লাইসেন্স?

প্রেস ক্লাব কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি সাংবাদিকদের পেশাগত ঐক্য, অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার সংগঠন। অথচ কিছু জায়গায় প্রেস ক্লাবের নাম ব্যবহার করে ব্যক্তিগত ব্যবসা, রাজনৈতিক তোষামোদ, দালালি কিংবা অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্র তৈরি হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

যারা প্রেস ক্লাবের পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার করেন, সরকারি কর্মকর্তাদের ভয় দেখান, ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করেন কিংবা রাজনৈতিক স্বার্থে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করেন, তাঁদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি জরুরি।

অনিবন্ধিত অনলাইন সংবাদমাধ্যমের ছড়াছড়ি

দেশে অনলাইন সংবাদমাধ্যমের বিস্তার ঘটেছে। প্রযুক্তির উন্নয়নে নতুন সংবাদমাধ্যম তৈরি হওয়া ইতিবাচক। কিন্তু নিবন্ধন, অনুমোদন, সম্পাদনা নীতি, সংবাদ যাচাই এবং জবাবদিহির প্রশ্ন উপেক্ষা করে কেবল একটি ওয়েবসাইট, ফেসবুক পেজ কিংবা পরিচয়পত্র তৈরি করেই কেউ কেউ সংবাদমাধ্যমের পরিচয় দিচ্ছেন।

এরপর সেই পরিচয়কে কেন্দ্র করে প্রেস ক্লাবের পদ-পদবি অর্জন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিজেদের প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

মনে রাখতে হবে, একটি সংবাদমাধ্যমের মান নির্ধারিত হয় তার সংবাদ, সত্যনিষ্ঠা, সম্পাদনার মান ও পেশাগত দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে। শুধু পরিচয়পত্র কিংবা প্রতিষ্ঠানের নাম থাকলেই সাংবাদিকতার মান তৈরি হয় না।

রাজনৈতিক চাটুকারিতা নয়, সাংবাদিকতা হোক জনগণের পক্ষে

সাংবাদিকের কাজ কোনো রাজনৈতিক দলের দালালি করা নয়। সরকার কিংবা বিরোধী দল—যেই ক্ষমতায় থাকুক, অন্যায় হলে প্রশ্ন করতে হবে। দুর্নীতি হলে প্রকাশ করতে হবে। জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ন হলে প্রতিবাদ করতে হবে।

কিন্তু সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি রাজনৈতিক নেতাদের তোষামোদ, ব্যক্তিগত সুবিধা আদায় কিংবা ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্ক দেখিয়ে প্রভাব বিস্তারে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে তিনি সাংবাদিকতার মূল আদর্শ থেকে সরে যাচ্ছেন।

সাংবাদিকতা কোনো রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র হওয়ার পেশা নয়। সাংবাদিকতা জনগণের পক্ষে সত্য প্রকাশের দায়িত্ব।

প্রকৃত সাংবাদিকদের সম্মান কোথায়?

যাঁরা রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে মাঠে সংবাদ সংগ্রহ করেন, ঝুঁকি নিয়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের তথ্য অনুসন্ধান করেন, সত্য প্রকাশের কারণে হুমকি ও হয়রানির শিকার হন, তাঁদের পরিচয় যেন নামসর্বস্ব সংগঠন ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে প্রশ্নবিদ্ধ না হয়।

একটি প্রেস ক্লাবের পদবি কিংবা কয়েকটি পরিচয়পত্র একজন মানুষকে পেশাদার সাংবাদিক বানাতে পারে না। সাংবাদিক হতে হলে প্রয়োজন সততা, দক্ষতা, দায়িত্বশীলতা, তথ্য যাচাই এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা।

সরকার, প্রশাসন ও সুশীল সমাজের প্রতি আহ্বান

দৈনিক সময়ের কণ্ঠ মনে করে, দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর পরিচয়, গঠনতন্ত্র, সদস্যপদ এবং কার্যক্রমে স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন।

প্রেস ক্লাবের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, প্রতারণা, দালালি কিংবা অন্য কোনো অপরাধের অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের প্রশ্ন—সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি অপরাধে জড়িত হন, তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধা কোথায়? আবার প্রকৃত সাংবাদিকদের যেন হয়রানি করা না হয়, সেই নিশ্চয়তাই বা কে দেবে?

শেষ কথা

আমরা প্রেস ক্লাবের বিরুদ্ধে নই; আমরা প্রেস ক্লাবের নামে অপকর্মের বিরুদ্ধে। আমরা সাংবাদিক সংগঠনের বিরুদ্ধে নই; আমরা সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে অন্যায়, অনৈতিকতা ও ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের বিরুদ্ধে।

প্রেস ক্লাব হবে সাংবাদিকদের মর্যাদার আশ্রয়স্থল, চাঁদাবাজি, দালালি, রাজনৈতিক চাটুকারিতা কিংবা ব্যক্তিগত আয়ের হাতিয়ার নয়।

দেশের প্রকৃত সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ, প্রশাসন এবং সচেতন নাগরিকদের এখনই সোচ্চার হতে হবে।

মনে রাখতে হবে—সাংবাদিকতার পরিচয় বিক্রি করে সাময়িক প্রভাব অর্জন করা যায়, কিন্তু সেই পরিচয়ের সম্মান অর্জন করতে হলে সততা ও দায়িত্বশীলতার বিকল্প নেই।

দৈনিক সময়ের কণ্ঠের সম্পাদকীয় অবস্থান: প্রেস ক্লাবের মর্যাদা রক্ষা হোক, অপসাংবাদিকতা ও অপরাধের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত হোক।

জাতীয় নিউজ

Please Share This Post in Your Social Media