Dhaka ০৫:১৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬, ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারতে তিন মাসে ২৫ মুসলিম হত্যায় নিরাপত্তা বাহিনী ও হিন্দুত্ববাদীরা

আন্তর্জাতিক রিপোর্ট
  • আপডেট টাইম : ১১:৩৮:৩৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬
  • / ৯০ ০০০ বার

ভারতে বিদ্বেষ ও ঘৃণামূলক প্রচারের কারণে গত তিন মাসে কমপক্ষে ২৫ জন মুসলিম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। চলতি বছরের মে থেকে জুলাই পর্যন্ত ভারতীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিজেপি সমর্থক উগ্র হিন্দুদের গণপিটুনিতে তারা নিহত হন।

তাদের মধ্যে ১৫ জন নিহত হয়েছেন পুলিশসহ রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে। বাকি ১০ জনকে হত্যা করেছে উগ্রবাদী হিন্দুরা। অন্যদিকে গত সাত মাসে হেট ক্রাইমে (ঘৃণামূলক অপরাধ) নিহত মুসলমানের সংখ্যা ৪৪ ছাড়িয়েছে। একই সময় মুসলমানদের বাড়িঘর ও ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে তিন হাজারের বেশি।

দক্ষিণ এশিয়ায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থা ‘সাউথ এশিয়া জাস্টিস’ এ তথ্য প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির ভারতবিষয়ক প্রকল্প ‘ইন্ডিয়া পারসিকিউশন ট্র্যাকার’-এর মাধ্যমে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, মুসলিম নিপীড়নের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ।

‘ইন্ডিয়া পারসিকিউশন ট্র্যাকার’ জানিয়েছে, তারা ২০২২ সাল থেকে ভারতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিদ্বেষমূলক প্রচারের কারণে হত্যাকাণ্ডের ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করে আসছে। এর মধ্যে চলতি বছরই এ ধরনের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি মুসলমান হত্যার শিকার হয়েছেন। তাই এ বছরটি হতে চলেছে ভারতে মুসলমানদের জন্য প্রাণঘাতী বছর।

সংস্থাটি জানায়, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে ৪৪ জন মুসলমান নিহত হয়েছেন হেট ক্রাইমের কারণে। এর মধ্যে ১৯ জন মুসলমান নিহত হয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। গণপিটুনি দিয়ে ২৫ জনকে হত্যা করেছে উগ্রবাদী হিন্দুরা। যারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন, তাদের কেউ সাজানো এনকাউন্টারে, কেউ নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে থাকা অবস্থায় নিহত হয়েছেন।

উগ্রবাদী হিন্দুদের হামলা থেকে রক্ষায় সাহায্য চেয়েও ভুক্তভোগীরা অনেক ক্ষেত্রেই কোনো সাহায্য পান না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শত শত মুসলমানকে আটক করেছে এ সময়। অনেকের বাড়িঘর, মসজিদসহ ধর্মীয় অনেক প্রতিষ্ঠান বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কোনো পূর্বঘোষণা ও নোটিস ছাড়া রাতে আকস্মিক হামলার কারণে অনেকে এক কাপড়ে বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশ, আসাম, কাশ্মীর এবং সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের পর ক্রমবর্ধমান হারে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে।

প্রতিবেদন অনুসারে, ছয়টি রাজ্যে দুই মাসেরও কম সময়ে অন্তত ২৩টি মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়েছে। অন্যদিকে আটটি রাজ্যে অন্তত ২১টি ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনায় এক হাজারের বেশি মুসলমানের বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে চলতি বছরে এখন পর্যন্ত এ ধরনের ধ্বংস হওয়া স্থাপনার সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট তার নিজস্ব ধ্বংসযজ্ঞবিরোধী সুরক্ষাব্যবস্থা প্রয়োগ করতে অস্বীকার করেছে এবং পরিবর্তে আদালত অবমাননার আবেদনগুলো হাইকোর্টে পাঠিয়েছে।

কাশ্মীরে জুলাইয়ে একটি হামলার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনী আড়াই হাজারেরও বেশি মুসলমানকে আটক করে। এ অভিযানের সময় তারা বিস্ফোরক দিয়ে দুটি পরিবারের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে দেশব্যাপী ছাত্র বিক্ষোভের সময় অন্তত ছয়টি রাজ্যে পুলিশ শুধু বেছে বেছে মুসলিমদের গ্রেপ্তার করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

চলতি বছরের মে থেকে জুলাই পর্যন্ত তিন মাসে যে ২৫ মুসলিম পুলিশের সাজানো এনকাউন্টার, নিরাপত্তা হেফাজত ও উগ্রপন্থিদের হামলায় নিহত হয়েছেন, তা ঘটেছে পাঁচটি রাজ্যে। রাজ্যগুলো হলোÑ উত্তরপ্রদেশ, আসাম, কাশ্মীর, পশ্চিমবঙ্গ ও মহারাষ্ট্র। নিহত এই ২৫ জনের মধ্যে ১১ বছর বয়সি মেয়ে এবং ১৬ বছরের এক ছেলেও রয়েছে।

পাঁচটি রাজ্যে মুসলিমদের লক্ষ্য করে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখা গেছে। সেখানে বিজেপির প্রথমবারের মতো রাজ্য নির্বাচনে জয়ের পরের দিনগুলোতে মসজিদ, মুসলিম মালিকানাধীন ব্যবসা এবং হকারদের বসতিতে হামলায় অন্তত দুজন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে একজন মসজিদ রক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ হারান।

নতুন সরকার মুসলিমদের বিরুদ্ধে ও লক্ষ্য করে এমন কিছু পদক্ষেপও নিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে জনকল্যাণমূলক সুবিধার সঙ্গে যুক্ত নাগরিকত্ব যাচাই, সংরক্ষণ তালিকায় পরিবর্তন, সংখ্যালঘুবিষয়ক ও মাদরাসা বাজেটে ৬২ শতাংশ কাটছাঁট এবং পশু জবাইয়ের বিষয়ে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ। সরকার ঈদুল আজহার মাত্র কয়েকদিন আগে পশু জবাইয়ের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ছাত্র বিক্ষোভের সময় পশ্চিমবঙ্গে একটি অভিযানে গ্রেপ্তার ১৪ জনের মধ্যে ১৩ জনই ছিলেন মুসলিম।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আটক করা কথিত ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ আদালতে হাজির না করে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে তুলে দিতে। অন্যদিকে সরকার তার প্রথম মাসেই ৪,৮০০ জনকে ‘নির্বাসিত’ করার দাবি করে। ৭৭টি মুসলিম সম্প্রদায়কে অনগ্রসর শ্রেণির সংরক্ষণ তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয় এবং মাদরাসাগুলোকে নজরদারির আওতায় আনা হয়।

আসামে বাংলাভাষী মুসলমানদের ‘পুশব্যাক’ বা জোর করে বহিষ্কার করা হচ্ছে। রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, দুই বছরে ১,৬৭৯ জনকে ‘ফেরত পাঠানো’ হয়েছে। অন্যদিকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী রাতে সীমান্ত বেড়ার ফাঁক দিয়ে শিশুসহ পরিবারগুলোকে নিয়ে যাচ্ছে এবং পুশব্যাক করছে।

ইন্ডিয়া পারসিকিউশন ট্র্যাকারের তথ্য অনুসারে, শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মুসলিমবিদ্বেষী ও ঘৃণামূলক বক্তব্য মুসলমানদের বিরুদ্ধে বৈষম্য ও ঘৃণামূলক অপরাধের পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

প্রতিবেদনে ভারতে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধিদের সতর্কবার্তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ভারতের শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতা যেভাবে মুসলমানদের অনুপ্রবেশকারী হিসেবে আখ্যায়িত করছেন, তা ভারতীয় মুসলিম নাগরিকদের বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করেছে এবং এটি আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বৈষম্যে উসকানি দেওয়ার শামিল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একজন মুসলিম বিচারক গণপিটুনির জন্য ১৪ জন গোরক্ষককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে তিনি হিন্দু চরমপন্থিদের কাছ থেকে হুমকির শিকার হন এবং তার জন্য বিশেষ পুলিশি নিরাপত্তার প্রয়োজন দেখা দেয়। আইন, নীতি এবং সরকারি বক্তব্যের মাধ্যমে মুসলিমদের বহিরাগত গোষ্ঠী হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। এর ফলে মুসলমানরা নিজেদের দেশেই ‘বিদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছেন এবং ভারতে তাদের নাগরিক হিসেবে টিকে থাকা ও অন্তর্ভুক্তি স্থায়ীভাবে কঠিন শর্তের জালে আবদ্ধ হচ্ছে।

জাতীয় নিউজ

ভারতে তিন মাসে ২৫ মুসলিম হত্যায় নিরাপত্তা বাহিনী ও হিন্দুত্ববাদীরা

আপডেট টাইম : ১১:৩৮:৩৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬

ভারতে বিদ্বেষ ও ঘৃণামূলক প্রচারের কারণে গত তিন মাসে কমপক্ষে ২৫ জন মুসলিম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। চলতি বছরের মে থেকে জুলাই পর্যন্ত ভারতীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিজেপি সমর্থক উগ্র হিন্দুদের গণপিটুনিতে তারা নিহত হন।

তাদের মধ্যে ১৫ জন নিহত হয়েছেন পুলিশসহ রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে। বাকি ১০ জনকে হত্যা করেছে উগ্রবাদী হিন্দুরা। অন্যদিকে গত সাত মাসে হেট ক্রাইমে (ঘৃণামূলক অপরাধ) নিহত মুসলমানের সংখ্যা ৪৪ ছাড়িয়েছে। একই সময় মুসলমানদের বাড়িঘর ও ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে তিন হাজারের বেশি।

দক্ষিণ এশিয়ায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থা ‘সাউথ এশিয়া জাস্টিস’ এ তথ্য প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির ভারতবিষয়ক প্রকল্প ‘ইন্ডিয়া পারসিকিউশন ট্র্যাকার’-এর মাধ্যমে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, মুসলিম নিপীড়নের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ।

‘ইন্ডিয়া পারসিকিউশন ট্র্যাকার’ জানিয়েছে, তারা ২০২২ সাল থেকে ভারতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিদ্বেষমূলক প্রচারের কারণে হত্যাকাণ্ডের ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করে আসছে। এর মধ্যে চলতি বছরই এ ধরনের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি মুসলমান হত্যার শিকার হয়েছেন। তাই এ বছরটি হতে চলেছে ভারতে মুসলমানদের জন্য প্রাণঘাতী বছর।

সংস্থাটি জানায়, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে ৪৪ জন মুসলমান নিহত হয়েছেন হেট ক্রাইমের কারণে। এর মধ্যে ১৯ জন মুসলমান নিহত হয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। গণপিটুনি দিয়ে ২৫ জনকে হত্যা করেছে উগ্রবাদী হিন্দুরা। যারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন, তাদের কেউ সাজানো এনকাউন্টারে, কেউ নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে থাকা অবস্থায় নিহত হয়েছেন।

উগ্রবাদী হিন্দুদের হামলা থেকে রক্ষায় সাহায্য চেয়েও ভুক্তভোগীরা অনেক ক্ষেত্রেই কোনো সাহায্য পান না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শত শত মুসলমানকে আটক করেছে এ সময়। অনেকের বাড়িঘর, মসজিদসহ ধর্মীয় অনেক প্রতিষ্ঠান বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কোনো পূর্বঘোষণা ও নোটিস ছাড়া রাতে আকস্মিক হামলার কারণে অনেকে এক কাপড়ে বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশ, আসাম, কাশ্মীর এবং সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের পর ক্রমবর্ধমান হারে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে।

প্রতিবেদন অনুসারে, ছয়টি রাজ্যে দুই মাসেরও কম সময়ে অন্তত ২৩টি মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়েছে। অন্যদিকে আটটি রাজ্যে অন্তত ২১টি ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনায় এক হাজারের বেশি মুসলমানের বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে চলতি বছরে এখন পর্যন্ত এ ধরনের ধ্বংস হওয়া স্থাপনার সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট তার নিজস্ব ধ্বংসযজ্ঞবিরোধী সুরক্ষাব্যবস্থা প্রয়োগ করতে অস্বীকার করেছে এবং পরিবর্তে আদালত অবমাননার আবেদনগুলো হাইকোর্টে পাঠিয়েছে।

কাশ্মীরে জুলাইয়ে একটি হামলার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনী আড়াই হাজারেরও বেশি মুসলমানকে আটক করে। এ অভিযানের সময় তারা বিস্ফোরক দিয়ে দুটি পরিবারের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে দেশব্যাপী ছাত্র বিক্ষোভের সময় অন্তত ছয়টি রাজ্যে পুলিশ শুধু বেছে বেছে মুসলিমদের গ্রেপ্তার করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

চলতি বছরের মে থেকে জুলাই পর্যন্ত তিন মাসে যে ২৫ মুসলিম পুলিশের সাজানো এনকাউন্টার, নিরাপত্তা হেফাজত ও উগ্রপন্থিদের হামলায় নিহত হয়েছেন, তা ঘটেছে পাঁচটি রাজ্যে। রাজ্যগুলো হলোÑ উত্তরপ্রদেশ, আসাম, কাশ্মীর, পশ্চিমবঙ্গ ও মহারাষ্ট্র। নিহত এই ২৫ জনের মধ্যে ১১ বছর বয়সি মেয়ে এবং ১৬ বছরের এক ছেলেও রয়েছে।

পাঁচটি রাজ্যে মুসলিমদের লক্ষ্য করে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখা গেছে। সেখানে বিজেপির প্রথমবারের মতো রাজ্য নির্বাচনে জয়ের পরের দিনগুলোতে মসজিদ, মুসলিম মালিকানাধীন ব্যবসা এবং হকারদের বসতিতে হামলায় অন্তত দুজন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে একজন মসজিদ রক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ হারান।

নতুন সরকার মুসলিমদের বিরুদ্ধে ও লক্ষ্য করে এমন কিছু পদক্ষেপও নিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে জনকল্যাণমূলক সুবিধার সঙ্গে যুক্ত নাগরিকত্ব যাচাই, সংরক্ষণ তালিকায় পরিবর্তন, সংখ্যালঘুবিষয়ক ও মাদরাসা বাজেটে ৬২ শতাংশ কাটছাঁট এবং পশু জবাইয়ের বিষয়ে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ। সরকার ঈদুল আজহার মাত্র কয়েকদিন আগে পশু জবাইয়ের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ছাত্র বিক্ষোভের সময় পশ্চিমবঙ্গে একটি অভিযানে গ্রেপ্তার ১৪ জনের মধ্যে ১৩ জনই ছিলেন মুসলিম।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আটক করা কথিত ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ আদালতে হাজির না করে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে তুলে দিতে। অন্যদিকে সরকার তার প্রথম মাসেই ৪,৮০০ জনকে ‘নির্বাসিত’ করার দাবি করে। ৭৭টি মুসলিম সম্প্রদায়কে অনগ্রসর শ্রেণির সংরক্ষণ তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয় এবং মাদরাসাগুলোকে নজরদারির আওতায় আনা হয়।

আসামে বাংলাভাষী মুসলমানদের ‘পুশব্যাক’ বা জোর করে বহিষ্কার করা হচ্ছে। রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, দুই বছরে ১,৬৭৯ জনকে ‘ফেরত পাঠানো’ হয়েছে। অন্যদিকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী রাতে সীমান্ত বেড়ার ফাঁক দিয়ে শিশুসহ পরিবারগুলোকে নিয়ে যাচ্ছে এবং পুশব্যাক করছে।

ইন্ডিয়া পারসিকিউশন ট্র্যাকারের তথ্য অনুসারে, শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মুসলিমবিদ্বেষী ও ঘৃণামূলক বক্তব্য মুসলমানদের বিরুদ্ধে বৈষম্য ও ঘৃণামূলক অপরাধের পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

প্রতিবেদনে ভারতে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধিদের সতর্কবার্তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ভারতের শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতা যেভাবে মুসলমানদের অনুপ্রবেশকারী হিসেবে আখ্যায়িত করছেন, তা ভারতীয় মুসলিম নাগরিকদের বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করেছে এবং এটি আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বৈষম্যে উসকানি দেওয়ার শামিল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একজন মুসলিম বিচারক গণপিটুনির জন্য ১৪ জন গোরক্ষককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে তিনি হিন্দু চরমপন্থিদের কাছ থেকে হুমকির শিকার হন এবং তার জন্য বিশেষ পুলিশি নিরাপত্তার প্রয়োজন দেখা দেয়। আইন, নীতি এবং সরকারি বক্তব্যের মাধ্যমে মুসলিমদের বহিরাগত গোষ্ঠী হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। এর ফলে মুসলমানরা নিজেদের দেশেই ‘বিদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছেন এবং ভারতে তাদের নাগরিক হিসেবে টিকে থাকা ও অন্তর্ভুক্তি স্থায়ীভাবে কঠিন শর্তের জালে আবদ্ধ হচ্ছে।