Dhaka ১২:০৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লটারিতে পোস্টিং: বদলি বাণিজ্য রোধে বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ

সিনিয়র বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট টাইম : ০৭:৩৯:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬
  • / ৫৭ ০০০ বার

গণপূর্ত অধিদপ্তর। ফাইল ছবি
মাথা ব্যথার কারণে মাথা কেটে ফেলাÑ এমন এক সিদ্ধান্তে গোল বেধেছে গণপূর্ত অধিদপ্তরে। বদলি বাণিজ্য রোধে লটারির পথে হেঁটেছিল গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। এই লটারি প্রক্রিয়ায় মানা হয়নি খোদ মন্ত্রণালয়ের প্রণীত ‘গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বদলি/পদায়ন নীতিমালা ২০২৫’। মাত্র এক মাস আগে বদলি হয়ে আসা কর্মকর্তাকেও এ লটারির আওতায় আনা হয়েছে এবং নির্ধারণ করা হয়েছে তার নতুন কর্মস্থল।

গণপূর্ত অধিদপ্তরে বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ অনেক পুরনো। গণঅভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। এ কারণে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন গণপূর্তে সব ধরনের বদলি স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন। পরে মন্ত্রণালয় লটারির মাধ্যমে বদলির উদ্যোগ নেয়। যার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে গত ‍বৃহস্পতিবার একযোগে ৭৬৭ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে বদলি করা হয়।

বাদের তালিকায় তিন পূর্ণ মন্ত্রী ও দুই প্রতিমন্ত্রী
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই লটারি প্রক্রিয়া তদারকি করেন। এভাবে পর্যায়ক্রমে সহকারী প্রকৌশলী, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে বদলি করা হবে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। সাধারণত কোনো কর্মকর্তাকে বদলি করতে হলে তাকে বদলিজনিত খরচ হিসেবে টিএ-ডিএ দেওয়া হয়। দূরত্ব অনুসারে পরিবহন ব্যয় নির্ধারণ করা হয়। খরচ সাশ্রয়ের এই সময়ে এত কর্মকর্তাকে একযোগে বদলি করা হলে এখন কমপক্ষে ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ হবে।

গত ৩০ জুলাই রাজধানীর সেগুনবাগিচায় পূর্ত ভবনের সম্মেলন কক্ষে প্রথমবারের মতো লটারির মাধ্যমে দেশের আটটি বিভাগের গণপূর্ত অধিদপ্তরের ৭৬৭ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে বদলি করা হয়। মন্ত্রণালয় বলছে, সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও গতিশীলতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সুষ্ঠু মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে এ ব্যবস্থা। লটারির ফলাফলের ভিত্তিতে ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন কার্যালয়ে ৩১৭ জন, রাজশাহী বিভাগে ৭৩, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৩৩, খুলনা বিভাগে ৭৪, বরিশাল বিভাগে ৪৪, সিলেট বিভাগে ৩৩, ময়মনসিংহ বিভাগে ২৯ এবং রংপুর বিভাগে ৬৪ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে পদায়ন করা হয়েছে।

তবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের লটারিভিত্তিক বদলি নিয়ে প্রকৌশলীদের একাংশ অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, এ ধরনের পদ্ধতি বদলি নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এতে ‘চেইন অব কমান্ড’ ভেঙে পড়ার পাশাপাশি দাপ্তরিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একটি অংশ মনে করছেন, স্বচ্ছতার নামে করা এই লটারি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ‘গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বদলি/পদায়ন নীতিমালা ২০২৫’ সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানের ‘চেইন অব কমান্ড’ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা যদি নিশ্চিত হন, তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারবেন না, তখন তিনি তার কথা মানবেন না। ফলে উন্নয়ন ও সংস্কার কাজের তদারকিতে ঘাটতি দেখা দেবে। দুর্নীতিরও বিস্তার ঘটতে পারে।

‘গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বদলি/পদায়ন নীতিমালা-২০২৫’ অনুযায়ী এক কর্মস্থলে ৩ বছরের আগে বদলি করার বিধান নেই। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে দুই বছরেও বদলি করা যায়। কিন্তু গণপূর্তের এ বদলিতে বিদ্যমান নীতিমালা মানা হয়নি। অনেক কর্মকর্তার বর্তমান কর্মস্থলে কর্মকাল এক বছর পূর্ণ না হলেও তাদের বদলি করা হয়েছে। এক মাস আগে অন্য কর্মস্থলে বদলি করা হয়েছিল, এমন কর্মকর্তাও বদলির তালিকায় রয়েছেন। বদলির ক্ষেত্রে কর্মদক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীলতার কোনো মূল্যায়ন করা হয়নি বলেও অভিযোগ তুলেছেন প্রকৌশলীরা। ২০২২ সালে যোগ দেওয়া অনেক নবীন প্রকৌশলীকে গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে পদায়ন করা হয়েছে। তাদের মতে, পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা না থাকায় এসব কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে হিমশিম খেতে পারেন।

লটারিভিত্তিক বদলিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও স্বাস্থ্যগত বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। চাকরিজীবী স্বামী-স্ত্রীকে একই কর্মস্থলে বা নিকটবর্তী এলাকায় পদায়নের নীতিমালাও অনুসরণ করা হয়নি। আবার অধিকাংশ পদায়ন নিজ জেলার আশপাশে হলেও কিছু কর্মকর্তাকে দূরবর্তী জেলায় পাঠানো হয়েছে। এতে বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। বদলির আদেশ জারি করার আগে সব দিক বিবেচনা করার বিধান রয়েছে। জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে এবং তুচ্ছ কারণে বদলি পরিহার করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া মানবিক দিক বিবেচনা করার কথাও উল্লেখ রয়েছে। তবে লটারিভিত্তিক বদলিতে এসব বিষয় বিবেচনা করা হয়নি। এতে এমন কর্মকর্তাদেরও বদলি করা হয়েছে যাদের পরিবারের সদস্যরা ক্যানসারে আক্রান্ত, চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ভবিষ্যতে একই পদ্ধতিতে কবে আবার বদলি করা হবে, সে বিষয়েও কোনো নির্দেশনা নেই।

জাতীয় নিউজ

লটারিতে পোস্টিং: বদলি বাণিজ্য রোধে বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ

আপডেট টাইম : ০৭:৩৯:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬

গণপূর্ত অধিদপ্তর। ফাইল ছবি
মাথা ব্যথার কারণে মাথা কেটে ফেলাÑ এমন এক সিদ্ধান্তে গোল বেধেছে গণপূর্ত অধিদপ্তরে। বদলি বাণিজ্য রোধে লটারির পথে হেঁটেছিল গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। এই লটারি প্রক্রিয়ায় মানা হয়নি খোদ মন্ত্রণালয়ের প্রণীত ‘গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বদলি/পদায়ন নীতিমালা ২০২৫’। মাত্র এক মাস আগে বদলি হয়ে আসা কর্মকর্তাকেও এ লটারির আওতায় আনা হয়েছে এবং নির্ধারণ করা হয়েছে তার নতুন কর্মস্থল।

গণপূর্ত অধিদপ্তরে বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ অনেক পুরনো। গণঅভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। এ কারণে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন গণপূর্তে সব ধরনের বদলি স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন। পরে মন্ত্রণালয় লটারির মাধ্যমে বদলির উদ্যোগ নেয়। যার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে গত ‍বৃহস্পতিবার একযোগে ৭৬৭ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে বদলি করা হয়।

বাদের তালিকায় তিন পূর্ণ মন্ত্রী ও দুই প্রতিমন্ত্রী
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই লটারি প্রক্রিয়া তদারকি করেন। এভাবে পর্যায়ক্রমে সহকারী প্রকৌশলী, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে বদলি করা হবে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। সাধারণত কোনো কর্মকর্তাকে বদলি করতে হলে তাকে বদলিজনিত খরচ হিসেবে টিএ-ডিএ দেওয়া হয়। দূরত্ব অনুসারে পরিবহন ব্যয় নির্ধারণ করা হয়। খরচ সাশ্রয়ের এই সময়ে এত কর্মকর্তাকে একযোগে বদলি করা হলে এখন কমপক্ষে ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ হবে।

গত ৩০ জুলাই রাজধানীর সেগুনবাগিচায় পূর্ত ভবনের সম্মেলন কক্ষে প্রথমবারের মতো লটারির মাধ্যমে দেশের আটটি বিভাগের গণপূর্ত অধিদপ্তরের ৭৬৭ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে বদলি করা হয়। মন্ত্রণালয় বলছে, সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও গতিশীলতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সুষ্ঠু মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে এ ব্যবস্থা। লটারির ফলাফলের ভিত্তিতে ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন কার্যালয়ে ৩১৭ জন, রাজশাহী বিভাগে ৭৩, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৩৩, খুলনা বিভাগে ৭৪, বরিশাল বিভাগে ৪৪, সিলেট বিভাগে ৩৩, ময়মনসিংহ বিভাগে ২৯ এবং রংপুর বিভাগে ৬৪ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে পদায়ন করা হয়েছে।

তবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের লটারিভিত্তিক বদলি নিয়ে প্রকৌশলীদের একাংশ অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, এ ধরনের পদ্ধতি বদলি নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এতে ‘চেইন অব কমান্ড’ ভেঙে পড়ার পাশাপাশি দাপ্তরিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একটি অংশ মনে করছেন, স্বচ্ছতার নামে করা এই লটারি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ‘গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বদলি/পদায়ন নীতিমালা ২০২৫’ সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানের ‘চেইন অব কমান্ড’ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা যদি নিশ্চিত হন, তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারবেন না, তখন তিনি তার কথা মানবেন না। ফলে উন্নয়ন ও সংস্কার কাজের তদারকিতে ঘাটতি দেখা দেবে। দুর্নীতিরও বিস্তার ঘটতে পারে।

‘গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বদলি/পদায়ন নীতিমালা-২০২৫’ অনুযায়ী এক কর্মস্থলে ৩ বছরের আগে বদলি করার বিধান নেই। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে দুই বছরেও বদলি করা যায়। কিন্তু গণপূর্তের এ বদলিতে বিদ্যমান নীতিমালা মানা হয়নি। অনেক কর্মকর্তার বর্তমান কর্মস্থলে কর্মকাল এক বছর পূর্ণ না হলেও তাদের বদলি করা হয়েছে। এক মাস আগে অন্য কর্মস্থলে বদলি করা হয়েছিল, এমন কর্মকর্তাও বদলির তালিকায় রয়েছেন। বদলির ক্ষেত্রে কর্মদক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীলতার কোনো মূল্যায়ন করা হয়নি বলেও অভিযোগ তুলেছেন প্রকৌশলীরা। ২০২২ সালে যোগ দেওয়া অনেক নবীন প্রকৌশলীকে গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে পদায়ন করা হয়েছে। তাদের মতে, পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা না থাকায় এসব কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে হিমশিম খেতে পারেন।

লটারিভিত্তিক বদলিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও স্বাস্থ্যগত বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। চাকরিজীবী স্বামী-স্ত্রীকে একই কর্মস্থলে বা নিকটবর্তী এলাকায় পদায়নের নীতিমালাও অনুসরণ করা হয়নি। আবার অধিকাংশ পদায়ন নিজ জেলার আশপাশে হলেও কিছু কর্মকর্তাকে দূরবর্তী জেলায় পাঠানো হয়েছে। এতে বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। বদলির আদেশ জারি করার আগে সব দিক বিবেচনা করার বিধান রয়েছে। জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে এবং তুচ্ছ কারণে বদলি পরিহার করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া মানবিক দিক বিবেচনা করার কথাও উল্লেখ রয়েছে। তবে লটারিভিত্তিক বদলিতে এসব বিষয় বিবেচনা করা হয়নি। এতে এমন কর্মকর্তাদেরও বদলি করা হয়েছে যাদের পরিবারের সদস্যরা ক্যানসারে আক্রান্ত, চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ভবিষ্যতে একই পদ্ধতিতে কবে আবার বদলি করা হবে, সে বিষয়েও কোনো নির্দেশনা নেই।