ডিসি আবু সাঈদ: পুরোনো প্রশাসনিক বলয়ের অনিয়মের অভিযোগে নজরদারি কতটা?
- আপডেট টাইম : ১২:৫৬:৪২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ২৫৩ ০০০.০০.বার দেখেছেন

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক হিসেবে মো. আবু সাঈদ দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় পাঁচ মাস পার হয়েছে। ২৯ মার্চ ২০২৬ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে তাঁকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং ২ এপ্রিল তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি সরকারি প্রিন্টিং প্রেসের উপপরিচালক (উপসচিব) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
নতুন জেলা প্রশাসক দায়িত্ব নেওয়ার পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল—দীর্ঘদিন ধরে একই দপ্তর বা গুরুত্বপূর্ণ শাখায় কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কার্যক্রম পর্যালোচনা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রশাসনিক সেবায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তর ও জেলা পরিষদ-সংলগ্ন প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে দীর্ঘদিনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে যেসব অনিয়মের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্যে এসেছে, সেগুলোর বিষয়ে বর্তমান জেলা প্রশাসনের নজরদারি কতটা কার্যকর?
দীর্ঘদিন একই জায়গায় থাকা কর্মকর্তাদের নিয়ে প্রশ্ন
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সংস্থাপন শাখার প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. কাউসার আহমেদের বিরুদ্ধে একই কর্মস্থলে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগের কথা প্রকাশ করা হয়। একই ধরনের অভিযোগ নিয়ে এর আগেও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবে এসব অভিযোগকে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে নয়, অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এখানেই বর্তমান জেলা প্রশাসকের দায়িত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা সামনে আসে।
দীর্ঘদিন একই দপ্তরে থাকা কোনো কর্মকর্তা অভিজ্ঞতার কারণে দক্ষ হতে পারেন। আবার একই জায়গায় দীর্ঘদিন অবস্থানের ফলে প্রশাসনিক প্রভাব বা স্বার্থের জটিলতা তৈরি হয়েছে কি না—সেটিও নিয়মিত প্রশাসনিক পর্যালোচনার বিষয় হতে পারে।
তাই প্রশ্ন হলো, অভিযোগ থাকলে সেগুলোর নথিভিত্তিক যাচাই হচ্ছে কি না এবং প্রয়োজন হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না।
জেলা পরিষদ ঘিরেও পুরোনো অভিযোগ
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পরিষদ নিয়েও অতীতে অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে। ২০২১ সালে জেলা পরিষদের নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম ও ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ ওঠার পর নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
২০২৩ সালে জেলা পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলেও সংবাদ প্রকাশিত হয়। অভিযোগকারীদের মধ্যে জেলা পরিষদের কয়েকজন সদস্য ছিলেন।
অতীতের এসব অভিযোগের প্রতিটি ঘটনার নিজস্ব প্রেক্ষাপট ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া রয়েছে। তাই সেগুলোকে বর্তমান কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসেবে সরাসরি ব্যবহার করা যাবে না।
তবে এসব নথি একটি বিষয় সামনে আনে—জেলা পর্যায়ের প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রয়োজন নতুন কোনো বিষয় নয়।
ডিসি আবু সাঈদের সামনে এখন মূল পরীক্ষা
একজন জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব শুধু সভা, পরিদর্শন কিংবা সরকারি কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জেলা প্রশাসনের অধীন বিভিন্ন শাখা, উপজেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের কার্যক্রমে সমন্বয় ও তদারকিও তাঁর দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাই ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসীর একটি স্বাভাবিক প্রত্যাশা হতে পারে—
কোনো কর্মকর্তা কত বছর ধরে একই পদে আছেন, তাঁর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ আছে কি না, অভিযোগের তদন্ত হয়েছে কি না, সরকারি নথিতে অনিয়মের কোনো প্রমাণ আছে কি না এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এসব বিষয় নিয়মিতভাবে পর্যালোচনা করা হোক।
এ ধরনের পর্যালোচনা কাউকে হয়রানি করার জন্য নয়; বরং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য।
অভিযোগ থাকলেই অপরাধী নয়
অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা মানেই তিনি দুর্নীতিবাজ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
অভিযোগের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য, সরকারি নথি, তদন্ত প্রতিবেদন, অডিট আপত্তি, নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র, প্রকল্পের ব্যয় বিবরণী এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত—সবকিছু যাচাই করা প্রয়োজন।
একইভাবে, কোনো অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত বা ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকলে সেটিও প্রতিবেদনে তুলে ধরা জরুরি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসীর প্রত্যাশা কী?
জেলার সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা খুব জটিল নয়—সরকারি দপ্তরে সেবা নিতে গিয়ে যেন কাউকে হয়রানির শিকার হতে না হয়, দালালনির্ভরতা কমে, সরকারি অর্থ ও প্রকল্পের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হয় এবং কোনো কর্মকর্তা দীর্ঘদিনের প্রভাব ব্যবহার করে নিয়মের বাইরে যেতে না পারেন।
সেই সঙ্গে অভিযোগ উঠলে অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত—উভয়ের বক্তব্য নেওয়া এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রত্যাশাও রয়েছে।
শেষ কথা
মো. আবু সাঈদ নতুন জেলা প্রশাসক। তাঁর দায়িত্বকাল এখনো দীর্ঘ হয়নি। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো নেতিবাচক সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো তথ্য এই প্রতিবেদনে নেই।
বরং প্রশ্নটি হলো—তিনি কি প্রশাসনের পুরোনো অভিযোগগুলো নথিভিত্তিকভাবে পর্যালোচনা করবেন? দীর্ঘদিন একই জায়গায় থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় নজরদারি করবেন? এবং অভিযোগ সত্য হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেবেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সময়ের সঙ্গে তাঁর প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডেই পাওয়া যাবে।
দৈনিক সময়ের কণ্ঠের অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং সরকারি নথিপত্র সংগ্রহ করে পরবর্তী পর্বে আরও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হবে।














