Dhaka ০৬:৪৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সম্পাদকীয় আইন-আদালত কি দলীয় প্রভাবের ঊর্ধ্বে? প্রশ্নটি এখন সাধারণ মানুষের

মো. বোরহান হাওলাদার জসিম
  • আপডেট টাইম : ১০:০৫:১৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
  • / ১৫৮ ০০০.০০.বার দেখেছেন

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো—রাষ্ট্রের আইন, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থা কি সত্যিই রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করতে পারছে?

সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ রয়েছে, কোথাও কোথাও প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকাণ্ডে রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করছে। আবার সাধারণ মানুষের একটি অংশের অভিযোগ—দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কেউ কেউ প্রশাসন, পুলিশ কিংবা বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের বিষয়; তবে অভিযোগগুলোকে একেবারে উপেক্ষা করাও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য নিরাপদ নয়।

আইনের শাসনের মূল কথা খুবই সহজ—একজন সাধারণ নাগরিক এবং একজন রাজনৈতিক দলের নেতা বা কর্মীর জন্য আইনের মানদণ্ড একই হতে হবে। কেউ ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত বলে বাড়তি সুবিধা পাবেন না, আবার কেউ বিরোধী দলের সঙ্গে যুক্ত বলে অন্যায়ভাবে হয়রানির শিকারও হবেন না।

সাম্প্রতিক সময়ে দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখল, সংঘাত কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের অপব্যবহারের অভিযোগ যেমন সামনে এসেছে, তেমনি বিরোধী রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘিরে জনভোগান্তি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা চলছে।

এখানেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি।

কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। একইভাবে তদন্ত শুরুর আগেই কাউকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করাও উচিত নয়। অভিযোগ, তদন্ত এবং বিচার—এই তিনটি ধাপকে আলাদা রাখতে না পারলে ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হয়ে যায়। সাম্প্রতিক একটি মামলায় আদালতের কার্যক্রম নিয়েও এমন প্রশ্ন সামনে এসেছে যে, তদন্তাধীন বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কতটা সতর্ক থাকা উচিত।

আমরা মনে করি, বিরোধী দলের অভিযোগকে সরকারবিরোধী প্রচারণা বলে উড়িয়ে দেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি বিরোধী দলের প্রতিটি অভিযোগকে সত্য ধরে নেওয়াও সাংবাদিকতা বা গণতন্ত্রের পথ নয়। অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তই হওয়া উচিত সত্য নির্ধারণের একমাত্র পথ।

রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিও আমাদের প্রশ্ন আছে।

দলীয় কর্মী অপরাধ করলে তার দায় কি শুধু ব্যক্তির, নাকি রাজনৈতিক সংগঠনেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে? দলীয় পরিচয় যদি কোনো ব্যক্তিকে প্রশাসনিক বা সামাজিকভাবে বাড়তি প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতৃত্বের উচিত সেই অপব্যবহারের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া। কারণ দলীয় শৃঙ্খলা শুধু সভা-সমাবেশ নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়; এটি জনগণের কাছে দলের জবাবদিহিরও বিষয়।

একইভাবে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। গণতান্ত্রিক কর্মসূচি পালন তাদের অধিকার; কিন্তু সেই কর্মসূচির কারণে সাধারণ মানুষের চলাচল, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা দৈনন্দিন জীবন অচল হয়ে পড়া কাম্য নয়। সংসদীয় গণতন্ত্রকে কার্যকর করতে সরকার ও বিরোধী—উভয় পক্ষের দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন।

আমাদের অবস্থান স্পষ্ট—আইন কারও দলীয় সম্পত্তি নয়। আদালত কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যালয় নয়। প্রশাসনও কোনো দলের ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান নয়।

যদি ক্ষমতাসীন দলের কেউ অপরাধ করেন, তার বিচার হতে হবে। বিরোধী দলের কেউ অপরাধ করলে তারও বিচার হতে হবে। আবার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কোনো নির্দোষ মানুষকে হয়রানি করা হলে তারও প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।

রাষ্ট্রের শক্তি প্রতিপক্ষকে দমন করার মধ্যে নয়; রাষ্ট্রের শক্তি হলো নিজের পক্ষের অন্যায়ও নিরপেক্ষভাবে বিচার করার সক্ষমতায়।

আজ সাধারণ মানুষ এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চায়, যেখানে থানায় অভিযোগ করতে গেলে পরিচয় জানতে চাওয়া হবে না, আদালতে ন্যায়বিচার পেতে রাজনৈতিক সুপারিশের প্রয়োজন হবে না এবং সরকারি দপ্তরে কাজ করাতে দলীয় পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে হবে না।

দৈনিক সময়ের কণ্ঠ মনে করে, রাজনৈতিক পরিবর্তন যতই হোক, আইনের শাসনের প্রশ্নে রাষ্ট্রের নীতি হওয়া উচিত একটাই—ব্যক্তি নয়, দল নয়, ক্ষমতা নয়; প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত।

এটাই গণতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা।
এবং এই পরীক্ষায় সরকার, বিরোধী দল, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আদালত ও গণমাধ্যম—সবারই দায়িত্ব রয়েছে।

জাতীয় নিউজ

Please Share This Post in Your Social Media