পূর্ব বাড্ডায় নেই খেলার মাঠ: স্থবির শৈশব, বিপন্ন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও নির্বিকার কর্তৃপক্ষ
- আপডেট টাইম : ০৮:১৪:২৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ৩২৩ ০০০.০০.বার দেখেছেন

ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানীর পূর্ব বাড্ডায় শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য নেই কোনো খেলার মাঠ কিংবা উন্মুক্ত পার্ক। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও বহুতল ভবনের চাপে এলাকাটি কংক্রিটের এক দমবন্ধ জঙ্গলে রূপ নিয়েছে। খেলার জায়গার এই তীব্র সংকট কেবল শিশুদের স্বাভাবিক শৈশবই কেড়ে নিচ্ছে না, বরং সামগ্রিকভাবে পুরো দেশের ভবিষ্যৎকে এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অথচ স্থানীয় প্রশাসন কিংবা নগর কর্তৃপক্ষের এ নিয়ে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পূর্ব বাড্ডার অলিগলিতে শুধুই আকাশচুম্বী ভবন আর বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। শিশুদের দৌড়ঝাঁপ করার মতো এক চিলতে জায়গাও ফাঁকা নেই। বাধ্য হয়ে তারা সময় কাটাচ্ছে ব্যস্ত রাস্তায় গাড়ির ঝুঁকি নিয়ে অথবা অন্ধকার গ্যারেজে। খেলার মাঠ না থাকায় এলাকায় বহুমাত্রিক সংকট ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করছে:
শারীরিক জটিলতা: কায়িক পরিশ্রম না থাকায় শিশু-কিশোরদের মধ্যে স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন, ডায়াবেটিস, চোখের দৃষ্টি কমে যাওয়া এবং হাড় ও পেশির দুর্বলতা দ্রুত বাড়ছে।
মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা: খেলার সাথী ও মুক্ত বাতাস না পেয়ে শিশুরা স্মার্টফোন, অনলাইন গেমিং ও সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত আসক্ত হয়ে পড়ছে। এর ফলে অল্প বয়সেই তাদের মধ্যে খিটখিটে মেজাজ, মনোযোগহীনতা, বিষণ্নতা ও একাকিত্ব বাড়ছে।
কিশোর অপরাধ ও বিপদগামী হওয়ার ঝুঁকি: ইতিবাচক বিনোদনের জায়গা না থাকায় কিশোর বয়সের বাড়তি শক্তি ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে। অলস সময় কাটিয়ে বহু তরুণ যুক্ত হয়ে পড়ছে তথাকথিত ‘কিশোর গ্যাং’, মাদক এবং অসামাজিক কার্যকলাপে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, সমস্যাটি কেবল একটি এলাকার নয়; এটি দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদের ওপর সরাসরি কুঠারাঘাত করছে। একটি জাতি টিকে থাকে তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেধা, শারীরিক সামর্থ্য ও নেতৃত্বের ওপর। সুস্থ বিনোদন ও খেলাধুলার মধ্য দিয়ে দলগত চেতনা, নেতৃত্ব ও সহনশীলতা শেখে তরুণরা। শৈশবেই যদি পুরো একটি প্রজন্ম শারীরিক ও মানসিকভাবে স্থবির হয়ে গড়ে ওঠে, তবে ভবিষ্যতে দেশ পরিচালনার মতো উদ্ভাবনী, উদ্যমী ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব সংকট দেখা দেবে। চিকিৎসা খাতের ওপর চাপ বাড়বে এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল হয়ে পড়বে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ওয়ার্ডভিত্তিক মৌলিক নাগরিক অধিকার নিশ্চিতের কোনো তাগিদ কারও মধ্যে দেখা যায় না। খালি জমিগুলো বিক্রি হয়ে বহুতল ভবনে পরিণত হওয়ায় মাঠের জন্য সরকারি জমি বরাদ্দের সুযোগও দিনে দিনে ফুরিয়ে আসছে।
এলাকাবাসীর জোর দাবি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থতা ও জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকারি কোনো খাসজমি থাকলে তা উদ্ধার করা অথবা জরুরি ভিত্তিতে জমি অধিগ্রহণ করে অবিলম্বে একটি উন্মুক্ত খেলার মাঠ ও পার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, শৈশববঞ্চিত এক রোগাক্রান্ত ও অসামাজিক প্রজন্ম তৈরির দায় এড়াতে পারবে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
















