সম্পাদকীয়-রাষ্ট্রের মোড় কোন দিকে—গণতন্ত্র, নাকি পুরোনো রাজনীতির পুনরাবৃত্তি?
- আপডেট টাইম : ১০:৪৩:২৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬
- / ৩৯১ ০০০.০০.বার দেখেছেন

বাংলাদেশের রাজনীতি আবারও এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—রাষ্ট্রের মোড় শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যাচ্ছে?
একটি গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষমতার কাঠামোর পরিবর্তন ঘটেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মানুষ আশা করেছিল—দেশে প্রতিষ্ঠিত হবে জবাবদিহি, আইনের শাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রত্যাশার জায়গায় নতুন কিছু প্রশ্নও তৈরি হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আমরা কি সত্যিই পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছি, নাকি শুধু ক্ষমতার কেন্দ্র ও রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন হয়েছে?
শেখ হাসিনাকে ঘিরে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিতর্ক এখনো শেষ হয়নি। তাঁর প্রত্যর্পণ নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আলোচনা ও টানাপোড়েন অব্যাহত রয়েছে। একই সময়ে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়েও নানা বক্তব্য সামনে আসছে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া শেখ হাসিনার ‘গোপন মৃত্যু’ বা তাঁকে নিয়ে নানা অপ্রমাণিত দাবিকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করা বিপজ্জনক। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে এমন তথ্য সামনে এলে প্রয়োজন সরকারি বা নির্ভরযোগ্য সূত্রের নিশ্চিত বক্তব্য। গুজব কখনো গণতন্ত্রের বিকল্প হতে পারে না।
অন্যদিকে বিএনপি এখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে। জনগণের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি। কারণ যে রাজনৈতিক শক্তি দীর্ঘদিন গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলেছে, ক্ষমতায় এসে তাদের কাছ থেকেই মানুষ সবচেয়ে বেশি জবাবদিহি আশা করবে।
বাংলাদেশের মানুষ আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, বিরোধী মতের ওপর চাপ এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হওয়ার অভিযোগ দেখেছে। তাই কোনো নতুন সরকার যদি একই ধরনের প্রবণতার দিকে এগোয়—সেটি যে দলের সরকারই হোক না কেন—তা জনগণ মেনে নেবে না।
আওয়ামী লীগের পরিবর্তে বিএনপি এলেই রাষ্ট্রের চরিত্র পরিবর্তন হয়ে যায় না; রাষ্ট্রের চরিত্র বদলায় প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন ও জবাবদিহির মাধ্যমে।
ক্ষমতার চেয়ার কারও স্থায়ী সম্পত্তি নয়। জনগণের ভোট, সংবিধান এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানই ক্ষমতার বৈধতার ভিত্তি। ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করেছে এবং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাদের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হচ্ছে—তারা কি অতীতের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে?
আজকের বাংলাদেশ আর আগের বাংলাদেশ নয়। মানুষ এখন প্রশ্ন করতে জানে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য যাচাই করতে জানে এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসও দেখিয়েছে।
সুতরাং রাষ্ট্রের নতুন নেতৃত্বের প্রতি আমাদের স্পষ্ট আহ্বান—এক দলের পতনের জায়গায় আরেক দলের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করবেন না। আওয়ামী লীগের ভুলের পুনরাবৃত্তি বিএনপির হাতেও যেন না ঘটে।
বাংলাদেশ কোনো ব্যক্তি, দল কিংবা পরিবারের সম্পত্তি নয়। বাংলাদেশ ১৮ কোটি মানুষের। রাষ্ট্র পরিচালনায় দলীয় আনুগত্যের চেয়ে নাগরিক অধিকার, আইনের শাসন এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তাই শেখ হাসিনা ফিরবেন কি না, আওয়ামী লীগ আবার রাজনীতিতে আসবে কি না, কিংবা বিএনপি কতদিন ক্ষমতায় থাকবে—এগুলো নয়।
প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কি সত্যিই একটি জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হবে, নাকি শুধু ক্ষমতার পালাবদল ঘটবে?
এই প্রশ্নের উত্তর সময় দেবে। কিন্তু সেই উত্তরের দায় শুধু সরকারের নয়—রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম এবং সর্বোপরি জনগণেরও।
ক্ষমতা বদলালেই পরিবর্তন হয় না; রাষ্ট্রের সংস্কৃতি বদলালেই প্রকৃত পরিবর্তন আসে।
— দৈনিক সময়ের কণ্ঠ সম্পাদকীয় বিভাগ
















