সম্পাদকীয় ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা কথিত সাংবাদিক সংগঠন—সাংবাদিকতার মর্যাদা কোথায়?
- আপডেট টাইম : ১০:২৭:২৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬
- / ৩৩৬ ০০০.০০.বার দেখেছেন

বাংলাদেশে সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা। রাষ্ট্রের অনিয়ম, দুর্নীতি, অপরাধ ও মানুষের অধিকারহরণের ঘটনা তুলে ধরে জনগণের সামনে সত্য প্রকাশ করাই সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে নানা নামের কথিত সাংবাদিক ইউনিয়ন, প্রেস ক্লাব, রিপোর্টার্স ক্লাব, অনলাইন সাংবাদিক সংগঠন ও ট্রাস্ট। এসব সংগঠনের বৈধতা, নিবন্ধন, সদস্যপদ ও সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে নানা প্রশ্ন থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে এগুলোই নিজেদের সাংবাদিক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করছে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
সাংবাদিকদের পেশাগত সংগঠন থাকা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু কোনো সংগঠনের নামের সঙ্গে ‘ইউনিয়ন’, ‘প্রেস ক্লাব’, ‘জাতীয়’, ‘আন্তর্জাতিক’, ‘ফেডারেশন’ কিংবা ‘ট্রাস্ট’ শব্দ যুক্ত হলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাংবাদিকদের বৈধ প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন হয়ে যায় না। বৈধতা ও নিবন্ধনের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট আইন, কর্তৃপক্ষ ও নথিপত্রের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হওয়া উচিত।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অভিযোগ রয়েছে—কিছু সংগঠন রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার ওপর নির্ভর করে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে। একসময় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ ছিল; এখন রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তনের পর কেউ কেউ বিএনপির নাম, পরিচয় বা ঘনিষ্ঠতার দোহাই দিয়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন—এমন অভিযোগও শোনা যাচ্ছে। যদি কোনো সংগঠন সত্যিই এমনভাবে রাজনৈতিক পরিচয়কে সাংবাদিকতার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে তা শুধু ওই সংগঠনের জন্য নয়, পুরো সাংবাদিক সমাজের জন্যই বিব্রতকর।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সাংবাদিকতার পরিচয় কি সংগঠনের ব্যানারনির্ভর হবে, নাকি পেশাগত যোগ্যতা, কর্মস্থল, প্রকাশিত সংবাদ, নৈতিকতা ও জবাবদিহির ওপর নির্ভর করবে?
সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল দেশের বিভিন্ন জেলার সাংবাদিকদের ডাটাবেজ তৈরির কাজ করছে বলে জানিয়েছে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের নিবন্ধনের আওতায় আনার বিষয়েও সরকারের পক্ষ থেকে প্রস্তাবের কথা প্রকাশ্যে এসেছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রকৃত সাংবাদিক ও কেবল পরিচয় ব্যবহারকারী ব্যক্তিদের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তাই এখন সময় এসেছে—জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নিজেদের সাংবাদিক সংগঠন দাবি করা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিবন্ধন, গঠনতন্ত্র, সদস্য তালিকা, কার্যক্রম ও বৈধতার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার। একই নামের একাধিক সংগঠন, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সংগঠন পরিচালনা কিংবা সাংবাদিকতার পরিচয়কে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার বানানোর প্রবণতা বন্ধ হওয়া দরকার।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা জরুরি—সব স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠন অবৈধ বা ভুয়া, এমন সাধারণীকরণও গ্রহণযোগ্য নয়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে পেশাদার সাংবাদিকদের বৈধ ও কার্যকর সংগঠন রয়েছে। যেমন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন নিজেদের ১৯৭২ সাল থেকে পেশাদার সাংবাদিকদের অধিকার ও কল্যাণে কাজ করা সংগঠন হিসেবে পরিচয় দেয়।
অতএব, প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে নয়; প্রশ্নটি সাংবাদিকতার পেশাগত মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে।
সাংবাদিকতার পরিচয় যেন কোনো রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়া, কথিত সংগঠনের সাইনবোর্ড কিংবা একটি ভিজিটিং কার্ডের ওপর নির্ভরশীল না হয়। একজন প্রকৃত সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত তাঁর সততা, তথ্যের নির্ভুলতা, অনুসন্ধানের সাহস এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি।
সাংবাদিকতার নামে ব্যাঙের ছাতার মতো সংগঠন নয়—প্রয়োজন স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও পেশাদার সাংবাদিক সংগঠন। কারণ সংগঠনের সংখ্যা বাড়লেই সাংবাদিকতার মান বাড়ে না; বরং কখনো কখনো এতে প্রকৃত সাংবাদিকদের মর্যাদাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এখন সময় এসেছে—কোনটি প্রকৃত সাংবাদিক সংগঠন, কোনটি কেবল নামসর্বস্ব প্ল্যাটফর্ম এবং কোনটি রাজনৈতিক বা ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা স্বচ্ছভাবে যাচাই করার।















