সম্পাদকীয় ধর্ষণের হিসাব বাড়ছে, নিরাপত্তা কোথায়?
- আপডেট টাইম : ১০:১৮:৪৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ২৮৫ ০০০.০০.বার দেখেছেন

বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, পরিস্থিতিকে আর বিচ্ছিন্ন কিছু অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ধর্ষণের প্রতিটি ঘটনা একটি পরিবারের নিরাপত্তাবোধকে ভেঙে দেয়, সমাজের আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বকে সামনে নিয়ে আসে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সারা দেশে ধর্ষণের অভিযোগে ৭ হাজার ৬৮টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক নারী ৫ হাজার ১৭১ জন এবং শিশু ১ হাজার ৮৯৭ জন। অর্থাৎ সরকারি মামলার হিসাবেই শিশু ধর্ষণের ঘটনাও ভয়াবহ সংখ্যায় রয়েছে। একই তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ধর্ষণের মামলা ছিল ৫ হাজার ৫৬৬টি।
অন্যদিকে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ১৪টি জাতীয় দৈনিকের সংবাদ বিশ্লেষণভিত্তিক জরিপে ২০২৫ সালে প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের ধর্ষণের ঘটনা ৩৭৬টি এবং কন্যাশিশু ধর্ষণের ঘটনা ২৪২টি পাওয়া গেছে। দুই উৎসের সংখ্যার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে, কারণ এগুলো একই ধরনের তথ্য সংগ্রহ পদ্ধতি ও সংজ্ঞার ভিত্তিতে তৈরি নয়।
শিশুদের জন্য ভয়াবহ বাস্তবতা
শিশু ধর্ষণের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। মহিলা পরিষদের ২০২৫ সালের জরিপে দেখা যায়, ৬ থেকে ৯ বছর বয়সী কন্যাশিশুরাই সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের শিকার হয়েছে—এই বয়সের ৮৬টি ঘটনা সংবাদে উঠে এসেছে। ১০ থেকে ১৩ বছর বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে সংখ্যা ছিল ৭০টি।
২০২৪ সালের মহিলা পরিষদের জরিপেও দেখা যায়, ৩৬৪টি সংবাদভিত্তিক ধর্ষণ ঘটনার মধ্যে ২২০ জনই ছিল ১৮ বছরের কম বয়সী কন্যাশিশু এবং ১৪৪ জন প্রাপ্তবয়স্ক নারী।
গৃহবধূদের হিসাব কোথায়?
নারী নির্যাতনের আলোচনায় গৃহবধূদের কথা বারবার সামনে আসে। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগত সতর্কতা প্রয়োজন। জাতীয় পর্যায়ে প্রকাশিত পুলিশি ধর্ষণ মামলার পরিসংখ্যানে গৃহবধূদের আলাদা করে সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। মহিলা পরিষদের ২০২৫ সালের জরিপে পেশাভিত্তিকভাবে গৃহিণীদের হত্যা, আত্মহত্যা ও যৌতুক-সংক্রান্ত নির্যাতনের তথ্য দেওয়া হয়েছে; কিন্তু ধর্ষণের ক্ষেত্রে গৃহবধূদের নির্দিষ্ট মোট সংখ্যা আলাদাভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
তাই সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব হলো—যে সংখ্যা যাচাইযোগ্য নয়, সেটি অনুমান করে প্রকাশ না করা। গৃহবধূদের ধর্ষণের প্রকৃত জাতীয় সংখ্যা জানতে হলে মামলা ও ভুক্তভোগীর পেশাগত পরিচয়ভিত্তিক সমন্বিত সরকারি তথ্য প্রকাশ প্রয়োজন।
সরকার বদলালেই কি সমস্যার সমাধান হবে?
সরকার যে-ই ক্ষমতায় থাকুক, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। একটি সরকারের আমলের সঙ্গে আরেকটি সরকারের আমলের তুলনা করতে হলে একই সংজ্ঞা, একই তথ্যের উৎস এবং একই সময়সীমা ব্যবহার করা জরুরি। তা না হলে শুধু সংখ্যার রাজনৈতিক ব্যাখ্যা তৈরি হবে, প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না।
২০২৫ সালের পুলিশি হিসাবে নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে মোট ২১ হাজার ৯৩৯টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের মামলা ৭ হাজার ৬৮টি। একই সময়ে বছরের শেষে দেশের ৯৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১ লাখ ৩২ হাজার ১০৭টি মামলা বিচারাধীন ছিল বলে উচ্চ আদালতের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
এই বিচারাধীন মামলার সংখ্যা আমাদের আরেকটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—মামলা গ্রহণের পর দ্রুত বিচার ও কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত হচ্ছে কি?
শুধু আইন নয়, চাই কার্যকর প্রয়োগ
ধর্ষণের বিরুদ্ধে আইন আছে। কিন্তু আইন থাকা এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগ এক বিষয় নয়। তদন্তে বিলম্ব, সাক্ষ্য-প্রমাণের দুর্বলতা, প্রভাবশালীদের চাপ, স্থানীয়ভাবে আপসের চেষ্টা কিংবা ভুক্তভোগীকে সামাজিকভাবে দায়ী করার প্রবণতা থাকলে আইন তার কাঙ্ক্ষিত প্রতিরোধমূলক ভূমিকা রাখতে পারে না।
শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও বিচারব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে ধর্ষণের অভিযোগ উঠলেই নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে—অভিযুক্ত যে-ই হোক।
ধর্ষণের সংখ্যা কমানোর প্রথম শর্ত হলো নির্ভরযোগ্য হিসাব। দ্বিতীয় শর্ত দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত। তৃতীয় শর্ত বিচার ও জবাবদিহি।
আজকের সম্পাদকীয়ের প্রশ্ন তাই শুধু—দেশে কতটি ধর্ষণ হয়েছে?
প্রশ্ন আরও বড়—
কতজন ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পেয়েছেন? কতজন শিশু নিরাপদে ঘরে ফিরতে পেরেছে? আর কত পরিবারকে বিচার পাওয়ার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে?
নারী ও শিশুর নিরাপত্তা কোনো সরকারের রাজনৈতিক সাফল্যের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং নাগরিকের অধিকার। তাই দল-মত নির্বিশেষে প্রয়োজন ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে কার্যকর রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি, দ্রুত বিচার এবং ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
















